মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১

Statement on the death of human rights defender Fr. Stanislaus Lourduswamy, SJ

We, the Catholic Church of Bangladesh, are deeply saddened by the death in custody of Fr. Stan Swamy, 84 year-old Jesuit priest and human rights defender in India, on 05 July 2021. The Episcopal Commission for Justice and Peace of the Catholic Bishops’ Conference of Bangladesh (ECJP-CBCB) extends the deepest condolences to the Church and the faithful in India and to Jesuit Fathers and to the Father’s family. We are united in prayers that the Father of all mercy to welcome him into His peace and light.

Fr. Stanislaus Lourduswamy, the elderly human rights defender, popularly known as Fr. Stan Swamy, died days before his scheduled bail hearing in the High Court of Bombay, which had been postponed due to his deteriorating health. Fr. Stan Swamy, who also suffered from Parkinson’s disease, had been placed on a ventilator at Holy Family Hospital in Mumbai over the weekend, more than a month after he was admitted to the hospital under court order with COVID-19. Fr. Stan Swamy was repeatedly denied bail, and died at the Holy Family Hospital, in Mumbai, India. The defender spent 9 months in jail under the anti-terror law, the Unlawful Activities Prevention Act (UAPA), denied bail and medical care in jail, and only transferred to a hospital when his condition became critical on 29 May.

Fr. Stan Swamy was born into a farming family in the southern Indian state of Tamil Nadu. He joined the Jesuits after turning 20. After his ordination, he served as a priest for more than 50 years. Fr. Stan Swamy advocated for the rights of indigenous tribes in Jharkhand and served as the director of the Indian Social Institute, a training school for marginalized communities in Bangalore, for more than a decade. He was the co-founder of the Persecuted Prisoners Solidarity Committee, an organization assisting those held in prison without having been convicted of a crime because they are still undergoing a trial. Fr. Stan Swamy worked among the Adivasis, Dalits and other marginalized communities so that the poor may have life and life to the full with dignity and honor.

In a Statement announcing Fr. Stan Swamy’s death, “Fr. Stan Swamy has been a dedicated advocate for the rights of Adivasi people, especially in the State of Jharkhand. He founded the Vistapan Virodhi Jan Vikas Andolan, an all-India platform to secure and protect the land rights of Dalit and Adivasi peoples, and was a prominent advocate against the forced displacement of Adivasi communities, typically occurring in the context of development and the mining of mineral-rich lands. He spoke out against the systemic discrimination and violence directed at the Adivasi community and he notably documented and advocated against the arrest of Adivasi youth, who are frequently accused of being “Naxalites” or “Maoists.” He has supported and inspired the most marginal and vulnerable communities to seek redress against violence and discrimination. His persecution and eventual arrest are direct reprisal for his peaceful work.”

"He was arrested on Oct. 8, 2020, by the National Investigation Agency, India’s counter-terrorism task force. The Jesuit priest was accused of being involved with a Maoist group, and inciting violence in the town of Bhima-Koregaon on Jan. 1, 2018. On 09 October, Fr. Stan Swamy was transferred 1,700 kilometres away from his home to Mumbai, Maharashtra, and remanded in the overcrowded Taloja Central Jail. At the time of his arrest Stan Swamy was already suffering from Parkinson’s disease, significant loss of hearing in both ears, and other serious underlying health issues. Initially jail authorities denied him warm clothes and a sipper cup which he needed due to the effects of Parkinson’s disease. Fr. Stan Swamy was eventually transferred from Taloja Central Jail to the Holy Family Hospital on 28 May 2021, when his condition had worsened severely. He tested positive for Covid19 on 30 May. Throughout the month of June he remained in a critical condition, and was moved to the Intensive Care Unit. Fr. Stan Swamy died on at 1.24 pm on 05 July."

His death in custody, and the continued incarceration of other defenders is a tragic indictment of India’s human rights record, and of the global community’s human rights commitments. We stand by Fr. Stan Swamy and other defenders accused and held under trial in this case, and believe they are being deliberately targeted for their human rights work. Standing united and without compromises the human rights values we believe that Indian government will understand their unjust steps and will release many other human rights defenders arbitrarily held in India before they meet the same fate as Fr. Stan Swamy.

We, Justice and Peace volunteers, experienced Fr. Stan Swamy as a gentle giant who walked miles with the tribals and marginalized people for 60 years. Fr. Stan Swamy was attentive to the needs of the poor communities, filled with courage and determination. He dedicated His life as a priest and human rights defender to the preferential option for the poor. In this simple way, he embodied the strong prophetic mission of the Church in India, as well as in global community. A man of justice, peace and unity, Fr. Stan Swamy has been deeply involved in integral human development in the local church and in the country. We learned that by denying him basic human rights, the state has shown its ugly coercive force to the people, Fr. Stan Swamy is a martyr, and a saintly example for us, he fought and died for justice and human rights for least, last and lost ‘all brothers and sisters’ in our ‘common home’ to build fraternal society.

Again, on behalf of the Episcopal commission for Justice and peace-CBCB we express deepest condolences to the Jesuits of Jamshedpur Jesuit Province, the Jesuits of Bangladesh, the family members, friends, lawyers, well-wishers and all those who stood by Fr. Stan Swamy, and we are united in prayers during this painful moment. We offer our thoughts, prayers and well-wishes during this dark time in human rights defenders in the country. We continue to stand in solidarity with Fr. Stan Swamy and we call for full accountability for his death while we demand justice. His example, good works, spirit, courage and kindness will not be forgotten and will continue to inspire.

 

Fr. Liton Hubert Gomes, CSC, Executive Secretary, Episcopal Commission for Justice and Peace, The Catholic Bishops’ Conference of Bangladesh, CBCB Centre, 24/C Asad Avenue, Mohammedpur, Dhaka 1207, Bangladesh, July 12, 2021

Most Rev. Bishop Gervas Rozario,DD, Chairman, Episcopal Commission for Justice and Peace of CBCB, Vice-President of CBCB & Bishop of Rajshahi


(Source: Picture and Information- Collected from website)

সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে আমাদের আচরণবিধি

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৭২ সালে ৫ জুন এ দিনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তবে  ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়ে আসছে। চলতি বছর দিবসটি উদযাপনের  বিষয়বস্তু ধরিত্রীর বাস্তুতন্ত্র অর্থাৎ প্রকৃতি-পরিবেশ ‘পুুনর্মূল্যায়ন, পুনগঠন, পুনরুদ্ধার’ (Reimagine, Recreate, Restore) করা। তবে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের পরিবেশ দিবসটির আরেকটি গুরুত্ব আছে- আজ থেকে জাতিসংঘের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশকও (২০২১-২০৩০) শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, এত দিন ধরে আমরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ আমাদের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সমন্বিত পরিবেশের যে ক্ষতি করেছি, তা পুনরুদ্ধারের জন্য বিশ্বের সব কটি রাষ্ট্র আগামী এক দশক ধরে চেষ্টা করবে। 

পরিবেশ সুরক্ষার্থে ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পুুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর আহ্বানকে সফলতা দান করতে আগামী ৭ বছর সময়কে "লাউদাতো সি কর্মসূচি প্লাটফর্ম" ঘোষণা করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে, পরিবার, ধর্মপল্লী, পালকীয় সেবা কমিশনসমূহ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, সেমিনারী, ব্রাদার হাউজ, সিস্টারদের কনভেন্ট, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং দলগতভাবে নিজেদের কিছু সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অঙ্গীকার ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে আহ্বান করেছেন। তবে আমাদের প্রত্যেকজনকে জানা দরকার, আমাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র বা প্রকৃতি-পরিবেশ কেমন আছে? আর কী করলে এর পুনরুদ্ধার সম্ভব? আমার দায়িত্বটা কীভাবে আমি পালন করতে পারি। আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে পোপ ফ্রান্সিস এর সর্বজনীন পত্র ‘লাউদাতো সি’ এর অনুপ্রেরণায় করণীয় কিছু উপলব্ধি ও কিছু সুপারিশ এখানে প্রদান করা হল যা নিজেদের জন্য একটি "অভিন্ন বসতবাটি সুরক্ষা আচরণবিধি" তৈরি করতে সহায়তা করবে। 

১. নিজের বেদনাদায়ক কষ্ট অনুভব- অন্তরে গভীরভাবে উপলব্ধি করি আবর্জনা এখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলে অপরিচ্ছন্ন-অস্বাস্থ্যকর নর্দমা তৈরি করেছি; গাছ কেটেছি কিন্তু রোপনে অবহেলা করে পরিবেশে ভারসাম্য নষ্ট করেছি; স্বার্থপরতা ও অতিভোগের কারণে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ করে ফেলেছি; প্রতিনিয়ত প্রচুর পানি অপচয় করছি, খাল ও নদীর জল বিষাক্ত করে ফেলেছি; এভাবে প্রকৃতি ও প্রতিবেশীদের প্রতি অনেক ক্ষতি  ইতোমধ্যে করেছি। এসব স্মরণ করে অনুতপ্ত হই ও মন-পরিবর্তন করি  এবং প্রকৃতি ও  প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অঙ্গীকার করে পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর সাথে আধ্যাত্মিকভাবে একাত্ম থাকি। 

২. সৃষ্টির মঙ্গলবার্তা বিশ্বাস- আমাদের আশা হল- ঈশ্বর, যিনি শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি পৃথিবীতেও হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং সব ধরনের অমঙ্গলকে পরাস্ত করতে পারেন। তিনি আমার, আপনার সহযোগিতায় তা করতে চান। আজ থেকেই আমার ও আপনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপে বড় কিছু অর্জন সম্ভব, কেননা আমরা জানি যে পরিবর্তন সম্ভব; এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা;

৩. সৃষ্টি-কেন্দ্রিক উপাসনা প্রস্তুত- যারা পরিবেশ সংরক্ষণ ও বাস্তব্যবিদ্যা গবেষণা করেন তাদের প্রতিপালক আসিসির সাধু ফ্রান্সিস এর মধ্যস্থতায় প্রার্থনা করতে পারি; সৃষ্টি-কেন্দ্রিক বা লাউদাতো সি উপাসনা উদযাপনকে উৎসাহিত করতে পারি এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন করা যায়; 

৪. পরিবারের যত্ন- আমি যেখানে বসবাস করছি সেটা একটি পরিবার; আমাদের পরিবার হল সৃষ্টি ও প্রকৃতির একটি অংশ; পরিবারের আরো বেশী যত্ন নিব। খাবারের সময়, অবসর সময়ে অথবা বিনোদনের সময়ে প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং দীনদরিদ্রদের অবস্থা নিয়ে সহভাগিতা করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং গরীবদের জন্য ভাল কিছু উদ্যোগ নিতে সন্তানদের উৎসাহিত করা যায়;

৫. তিনটি ‘পি’ (three P’s)- ‘লাউদাতো সি’ পত্রটির নিবিড় সমন্বয় ও কার্যকরী সাড়াদানের ক্ষেত্রে তিনটি ‘পি’ (three P’s) অনুধ্যানে করণীয়সমূহ স্মরণ করতে পারি- plant বা গাছ-গাছড়া লাগানো, protect বা রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও promote বা সংবর্ধিত করা অর্থাৎ ‘লাউদাতো সি’র মাণ্ডলিক শিক্ষা সকলের নিকট প্রকাশ ও প্রচার করা;

৬. পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা- নিজের দেহ থেকে শুরু করে জামাকাপড়, ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, সমাবেশস্থল, প্রভৃতির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা; সন্তানদেরও অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করবো। বাড়ির চারিপাশের প্লাস্টিক, নর্দমা ও আবর্জনা পরিস্কার করতে উদ্যোগ গ্রহণ ও নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা যায়;

৭. অপচয়রোধ ও ঋণ পরিশোধ- প্রয়োজন মাফিক কেনাকাটা, পরিমিত রান্না করা; প্রয়োজন অতিরিক্ত খরচপাতি, জিনিসপত্র ও দ্রব্যসামগ্রীর অপব্যবহার, ভোজনবিলাস ও অতি ভোগের মানসিকতা বর্জন করা; বাড়িতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিভিশন, এসি, পানির কল, বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের পর বন্ধ রাখাতে সর্বদা সচেতন থাকব। ক্রেডিট ইউনিয়নসহ সকল প্রকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা; ঋণ গ্রহণ করে বিনোদন বা উৎসব আয়োজন থেকে বিরত থাকা;

৮. স্বাস্থ্যসম্মত খাবার- শাকসবজি, ফুল ও ফলের বাগান করা এবং খাবার হিসেবে ব্যবহার করা। প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান করা; মাংস গ্রহণ পরিমিত করা, পরিমিত পরিবেশন ও পরিমিত ভোগ, দেশীয় পণ্য ব্যবহার করার মনোভাব তৈরি করা; 

৯. বাগান ও জৈবসার- রান্নাঘরের অবশিষ্টাংশ, পাতা-লতা ও আবর্জনাগুলি মিশ্রিত করে উত্তম সার তৈরি করা যায় এবং এসব গাছের বৃদ্ধিতে আরও ভাল সার হিসেবে সহায়তা করে। গ্রামের বাড়ির আঙ্গিনায় অথবা শহরে বাসাবাড়িতে টবে বারান্দায় বা ছাদে অথবা জানালার পাশে অথবা কর্মস্থলে শাক-সবজি-ফুল বাগান তৈরি করা ও নির্ধারিত গাছ, শাক-সবজি বা ফুলগাছ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সন্তানদের দায়িত্ব বন্টন করা; 

১০. দূষণমুক্ত পরিবেশ- শব্দ, বায়ূ, জল এবং সকল প্রকার দূষণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা; গণপরিবহন ব্যবহার করা এবং পরিবহনের দূষণকারী কর্মক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে; 

১১. পানি অপচয়রোধ- যারা পানীয় জলের চরম সংকটে আছে তাদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে আমরা  স্নানে পরিমিত পানি ব্যবহার বা আগের চেয়ে একটু কম পানি ব্যবহার করা, হাতমুখ ধোয়ার সময় কলের পানি নষ্ট না করি, যতটুকু পান করতে চাই ততটুকু পানি গ্লাসে ঢেলে পান করতে পারি। আমাদের এমন ক্ষুদ্র ক্ষ্রদ্র অভ্যাস পানি অপচয় অনেক হ্রাস করবে; 

১২. প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা- আমরা এমুহূর্তে প্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারছি না তাই সঠিকভাবে ব্যবহার ও প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পলিথিন ব্যাগ একেবারেই বাদ দিতে হবে কারণ এর ক্ষতির ধরন বহুমাত্রিক এবং বাড়ছে- মাটি নষ্ট করে জমিতে ফসল উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করছে, শহরে নর্দমা বের হওয়ার পথ বন্ধ করে ব্যাপক ক্ষতি করছে এবং আগুনে দিলে গ্যাস হয়ে বায়ুদূষণ করে মানবদেহের সংঘাতিক ক্ষতি করবে; 

১৩. কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহার- পাটের তৈরি চটের ব্যাগ অথবা ভারী ও শক্ত কাপড় পুনঃব্যহার করে ব্যাগ তৈরি করে বাজারে বা বাড়ির নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়;

১৪. পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা- লাউদাতো সি পত্রটির অনুপ্রেরণায় সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক শিক্ষা বিস্তার করা সম্ভব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ডাইয়োসিস, ধর্মপল্লী, ক্লাব, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, পরিবারে, যোগাযোগ মাধ্যমে, ধর্মশিক্ষাদানে ও অন্যত্র। পরিবেশগত সচেতনতা এবং কর্মকাণ্ড তৈরি লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবেশগত চেতনায়নমূলক শিক্ষা পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করতে পারে; 

১৫. পরিবেশ বিষয়ক বই ও পত্রিকা পড়া- ব্যক্তিগতভাবে এবছর পরিবেশ বিষয়ক একটি বই পড়ার অঙ্গীকার করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের গ্রাহক হয়ে পাঠ করা; লাউদাতো সি বিষয়ক একটি শিক্ষা সেমিনারে অংশগ্রহণ করা; যা যা নতুন শুনছি তার কিছু অংশ মনে রাখতে চেষ্টা করা। আমরা যা শুনি তার মাত্র ১০ শতকরা এক বছর পর মনে রাখতে পারি। আগ্রহ অটুট থাকলে মনে রাখার শতকরা হারও বাড়বে;

১৬. অভিজ্ঞ সহায়ক নিমন্ত্রণ- নিজেদের সংঘের, বা প্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহণকারী অংশীজনের সাথে আপনার শিক্ষণ সহভাগিতার ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে আপনাকে সহায়তা করতে বাইরে থেকে অভিজ্ঞ সহায়ক বা বক্তা ডেকে আনুন;

১৭. নিজে জানুন ও অন্যকে জানান- আমাদের দেশে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে সরকার কাজ করছে, দেশী সংস্থা কাজ করছে, বিদেশী সংস্থা কাজ করছে। তাদের কাজ সম্পর্কে জানা ও অপরকে জানানো, তাদের কাজে সহযোগিতা করা। প্রকৃতি ও পরিবেশ বা 'লাউদাতো সি' বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জোটে (networking) যোগ দিন; নিজের চেষ্টায় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ, ফলাফল ও প্রতিরোধ সম্পর্কে আরো বেশী করে জানুন। পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে মণ্ডলীর শিক্ষা কী, মহামান্য পোপ মহোদয় বার বার কী আহবান রাখছেন- তা জানুন;

১৮. একজনকে দায়িত্ব প্রদান- আপনার সংঘে বা প্রতিষ্ঠানে এমন একজনকে বাছাই করুন যে কী না আপনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আগামী বছর এই বিষয়ে নিজে আরো জানবেন, সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের সকলকে জানাবেন ও বাইরে অন্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন; 

১৯. সহভাগিতা ও আলোচনা- আপনার যা যা নতুন শিক্ষণ (learning) তা তা আপনার সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার অংশীজনদের (stakeholders) জানান। যেসমস্ত চিঠি, দলিল, লেখা পাচ্ছেন তা সহভাগিতা করুন, তাদের কেন জানাচ্ছেন তা-ও ব্যাখ্যা করুন। আপনার প্রত্যাশা খুলে বলুন। কোনো নিয়মিত সভায় সকলের সাথে এই বিষয় আলাপ করতে ঘন্টাখানেক সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে;

২০. কর্মস্থলে সচেতনতা- কর্মস্থলে প্রয়োজন ছাড়া কাগজে প্রিন্ট না করা, প্রয়োজনে কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট করা এবং সুযোগ থাকলে কাগজ পুনঃব্যবহার করতে পারি; কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য অফিস সরঞ্জামসমূহ ব্যবহারের পরে বন্ধ রাখব; দলীয়ভাবে গাড়ী ব্যবহার করার মাধ্যমে কার্বন ব্যবহার হ্রাস করতে পারি; 

২১. সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ- কর্মস্থলে ‘ধন্যবাদ’ ও ‘স্বাগত’ এমন সৌজন্যসূচক শব্দ ব্যবহার, ইতিবাচক কথা বলা, ইতিবাচক শব্দ ব্যবহার, নোংরা শব্দ পরিহার, সমালোচনামূলক কথা না বলা, বিচারকি কথা-বার্তা পরিহার কর্মপরিবেশ সুন্দর রাখে। অযাচিত চাটুকারিতার স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা; কাজের সময় অযথা অন্যের নিকট বসে সময় নষ্ট না করা বরং তাকে কাজ করতে দেয়া এবং নিজে ভাল কাজ করা, কাজে সৃজনশীল চিন্তা করা, অবসর সময়ে উদ্দীপনামূলক লেখা পড়ে নতুন চিন্তা আহরণ করা; 

২২. সত্য মতকে সত্যরূপে গ্রহণ- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিত্তিহীন গুজব ও ‘মতের অরণ্য’ থেকে  বেরিয়ে এসে মূলধারার গণমাধ্যমের উপর নির্ভর করা যেন যথার্থ আনন্দ, গভীর তৃপ্তি, প্রকৃত সত্য আহরণ করা যায়;

২৩. ছুঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি বর্জন- অর্থনীতি, উৎপাদন ও জিনিসপত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে- সংগ্রহ কর-চাহিদা পূরণ কর-ছুঁড়ে ফেলার (take-make-dispose) বর্তমানযুগে প্রচলিত উন্নয়নের মডেলের পরিবর্তে লাউদাতো সি'র অনুপ্রেরণা- পুনর্নবীকরণ-পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ-অন্যের সাথে সহভাগিতার (renew-remake-share) রূপান্তরশীল প্রক্রিয়া প্রচলন ও অনুুসরণ করা;

২৪. পবিত্র আহ্বান হিসেবে গ্রহণ- নিজের কল্যাণের কথা ভেবেই প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশীর সুরক্ষা সুসংবাদটি পবিবারের আপনজন ও বন্ধুবান্ধবদের জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই এটি পবিত্র একটি আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করা যায়;

২৫. নিজের অংশগ্রহণটা অপরিহার্য- যদি ভাল কিছু করি তবে ‘আরো ভাল’ কিছু করতে চেষ্টা করি, যদি আরো ভাল কিছু করে ফেলেছি তবে ‘উত্তম কিছু’ করতে চেষ্টা করি, আর যদি উত্তম কিছু করে থাকি তবে ‘অতি উত্তম কিছু' করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারি;

২৬. সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন- সকল পযায়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল থাকা দরকার। যেমন- প্রথমত, সমন্বিত পরিবেশ সরক্ষার্থে বিভিন্ন বাসস্তুতন্ত্র বা প্রকৃতি-পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বর্তমান সঠিক অবস্থা জানা থাকতে হবে এতে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, লোকজ জ্ঞানের সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের সমন্বয় করে পরিকল্পনা সাজানো দরকার। কারণ পৃথিবীব্যাপী প্রতিবেশ রক্ষায় লোকায়ত জ্ঞান, স্থানীয় সংরক্ষণ পদ্ধতি, জনগোষ্ঠীভিত্তিক সংরক্ষণ উদ্যোগগুলো বড় ভূমিকা রাখছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয়ত, স্থানীয় ও আঞ্চলিক সুরক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দেওয়ার সময় এখনই, সবাইকে তা মানতে হবে। প্রকৃতিকেন্দ্রিক ও জবাবদিহিমূলক মনিটরিং ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং তবেই সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষনের সুফল পাওয়া যাবে।

২৭. অবিরত প্রার্থনা করি- যদি কিছুই করতে না পারি তবে পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে সরাসরি যারা জড়িত তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তেনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের জন্যেও প্রার্থনা করুন। দীনদরিদ্র মানুষ যারা অমানবিক ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন তাদের জন্য প্রার্থনা অব্যাহত রাখুন। এই বিশ্ব জানতেও পারেনা প্রার্থনায় যে কতো আশ্চর্য্য কাজ হয়!     

করোনাভাইরাস মহামারী শিখিয়েছে আমাদের আরও বেশি যত্নবান ও রক্ষণাবেক্ষণ মনোভাব প্রয়োজন। পোপ মহোদয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা ‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ উদযাপন করছি। ইতোমধ্যে অনেকে নীরবে কাজ করে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেছি। ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পোপ ফ্রান্সিসের এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে আগামী ৭ বছর অবিরত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করবে। আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ  "অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি" অনুসরণ করি তবেই মহান কিছু অর্জন সম্ভব হবে। ধরিত্রীর বুকে আনবে নতুন ছন্দ, জাগাবে নতুন আশা; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।

মঙ্গলবার, ২৫ মে, ২০২১

লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম


'লাউদাতো সি' সর্বজনীন পত্রটির ৭টি লক্ষ্য

১. 'লাউদাতো সি সপ্তাহ-২০২১' (মে ১৬-২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ) এর সমাপ্তি দিবসে মে ২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দে ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তরের প্রধান কার্ডিনাল পিটার টার্কসন সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণে আগামী ৭ বছর সময়কে 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' (Laudato Si Action Platform-LSAP) হিসেবে  ঘোষণা করেছেন। কার্ডিনাল মহোদয় বলেছেন- 'লাউদাতো সি' সর্বজনীন পত্রটি প্রকাশিত হওয়া থেকে আজ ছয় বছর অবধি জগতের ও দীনদরিদ্রদের আর্তনাদ দিন দিন আমাদের কাছে আরও হৃদয় বিদারক হয়ে উঠেছে। আমাদের বিজ্ঞানী এবং তরুনদের বার্তা ক্রমবর্ধমানভাবে উদ্বেগজনক- 'আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি।'

২. 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' বহুমাত্রিক সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়ে সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণের দিকে সাত বছরের যাত্রা। কার্ডিনাল বলেছেন- এই সাতটি বছর হবে সক্রিয় কর্মসূচিভিত্তিক একটি যাত্রা, তবে এখন আগের চেয়ে আরো বিস্তর কাজ করার সময়; সুনির্দিষ্ট বহুমাত্রিক সৃজনশীল কর্মসূচি গ্রহণের সময় এখনই। কার্ডিনাল মহোদয় 'লাউদাতো সি' সর্বজনীন পত্রটির সাতটি লক্ষ্য ব্যাখ্যা করেছেন-

(ক) জগতের আর্তনাদে আমাদের সাড়াদান অর্থাৎ পৃথিবী নামক বাগানটি চাষ করা, যত্ন নেওয়া, তত্ত্বাবধান করা, সুরক্ষা করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা (আদি ২:১৫); 

(খ) দীনদরিদ্রদের কান্নায় আমাদের প্রতিক্রিয়া অর্থাৎ আমরা সকলে মিলে একটি মাত্র মানবপরিবার, অভিন্ন বসতবাটিতে সকলের সমান অধিকার রয়েছে তা অনুধাবন করা;

(গ) পরিবেশগত অর্থনীতি অর্থাৎ আরও ন্যায়-সঙ্গত, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই অর্থনীতি হতে হবে যা কাউকে পিছনে ফেলে রাখে না; 

(ঘ) সরল জীবনযাত্রা গ্রহণ অর্থাৎ সহজ সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে জগতের বেদনাদায়ক বিষয়সমূহে সচেতন হওয়া ও নিরাময়ের উদ্যোগ নেওয়া; 

(ঙ) পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা অর্থাৎ পরিবেশগত সচেতনতা এবং কর্মকাণ্ড তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবেশ সংরক্ষণ ও চেতনায়নমূলক শিক্ষা পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করা;

(চ) পরিবেশগত আধ্যাত্মিকতা অনুশীলনে গভীরভাবে অনুধাবন করা যে মানবজীবন তিনটি সম্পর্কযুক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যথা-  ঈশ্বরের সঙ্গে, আমাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে এবং পৃথিবীর সঙ্গে; সুতরাং সৃষ্টি-কেন্দ্রিক উপাসনা উদ্যাপনকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন করা এবং 

(ছ) সমদায়িত্ববোধ প্রেরণায় অংশগ্রহণমূলক বহুমাত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করা। পত্রটির মৌলিক অনুপ্রেরণায় আমাদের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।  

৩. এ উপলক্ষে পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এক বার্তায় জোর দিয়ে বলেছেন- আসুন, একসাথে কাজ করি, কেবলমাত্র আমরা এইভাবেই আমাদের ভবিষ্যতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই ধরিত্রী গড়তে সক্ষম হবো, এটাই আমাদের আশা। পোপ মহোদয় বার্তায় অভিন্ন বসতবাটির যত্নে তাঁর আবেদনটি 'পুনর্নবীকরণ' করে বলেন- "আসুন আমরা আমাদের মাতৃভূমির যত্ন নিতে এগিয়ে আসি; আসুন, আমাদেরকে সম্পদের শিকারী করে তোলে এমন স্বার্থপর প্রলোভনকে কাটিয়ে উঠি; আসুন, পৃথিবী এবং সৃষ্টির উপহারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই; আসুন, আমরা এমন একটি জীবনযাত্রা এবং এমন একটি সমাজের উদ্বোধন করি যা শেষ পর্যন্ত পরিবেশ বান্ধব ও পরিবেশ-টেকসই হয়। সবার জন্য আরও একটি সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দিতে আমাদের সুযোগ রয়েছে। পিতা ঈশ্বরের নিকট থেকে আমরা একটি সুন্দর বাগান পেয়েছি, আমাদের  সন্তানদের জন্য আমরা একটি মরুভূমি রেখে যেতে পারি না।" তিনি সকলকে এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানান বিশেষত- পরিবার, ধর্মপল্লী, ডাইয়োসিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, খামার, সংগঠন, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে জড়িত সম্পৃক্ত হতে আহ্বান জানান। 

৪. বিশেষত বিগত 'লাউদাতো সি বছর' এ (মে, ২০২০ - মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ) ৭০০,০০০ গাছ লাগানোর উদ্যোগের জন্য কার্ডিনাল টার্কসন এ সময় বাংলাদেশের কাথলিক খ্রিস্টভক্তগণের প্রশংসা করেছেন। ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন' নামক পুণ্য দপ্তর আগামী ৪ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দে আসিসির সাধু ফ্রান্সিস এর পর্বদিবসে 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' এর কর্মসূচি উদ্বোধন করবে এবং এ সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে, পরিবার, ধর্মপল্লী, পালকীয় সেবা কমিশনসমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, সেমিনারী, ব্রাদার হাউজ, সিস্টারদের কনভেন্ট, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, সকল প্রকার প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং দলগতভাবে নিজেদের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে আহ্বান করছে যেন একই দিনে আমরা একযুগে বহুমাত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করতে পারি।

৫. ভাটিকানের 'পরিবেশ ও সৃষ্টি' নামক দপ্তরের সমন্বকারী ফা. যোসট্রম আইজাক কুরিথাডাম বলেছেন- আমাদের অভিন্ন বসতবাটির এবং সৃষ্টির সমস্ত সদস্যদের প্রতি যত্নবান হতে পবিত্র আত্মা কীভাবে বিশ্বব্যাপী মণ্ডলীকে উদ্বুদ্ধ করছে এটি দেখতে অনুপ্রেরণাদায়ক; 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' হল সমন্বিত পরিবেশ বিষয়ক চেতনায় পুরোপুরি টেকসয়ের অভিমুখে যাত্রা। তিনি আরো বলেছেন- লাউডাতো সি বছর' সমাপ্ত হওয়ার পর থেকেই সকল খ্রিস্টভক্তগণ ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাৎসরিক বিশ্বব্যাপী প্রার্থনা এবং অভিন্ন বসতবাটির যত্ন উদযাপনের জন্য 'সৃষ্টি উদ্যাপন কাল' এর দিকে মনোনিবেশ করবেন। ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তরের সেক্রেটারি মন্সিনিয়র ব্রুনো মারি দোফে- সকল খ্রিস্টভক্তদের বিশ্বব্যাপী 'সৃষ্টি উদ্যাপন কাল' পালনে পুণ্যপিতা পোপ ফান্সিসের আহ্বানের কথা স্মরন করে দিয়ে বলেছেন- আমরা বিশপদের এবং মাণ্ডলিক সংস্থাসমূহকে 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে নিজস্ব বিবৃতি প্রকাশ করতে উৎসাহিত করছি।

৬. অন্যদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পর্ষদও ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ৫ জুন এ দিনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে  ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়ে আসছে। চলতি বছর দিবসটি উদযাপনের বিষয়বস্তু ছিল ধরিত্রীর বাস্তুতন্ত্র অর্থাৎ প্রকৃতি-পরিবেশ ‘পুুনর্মূল্যায়ন, পুনর্গঠন, পুনরুদ্ধার’ (Reimagine, Recreate, Restore) করা। তবে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের পরিবেশ দিবসটির আরেকটি গুরুত্ব আছে- আজ থেকে জাতিসংঘের ‘বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক’ (২০২১-২০৩০ খ্রিস্টাব্দ) শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, এত দিন ধরে আমরা উন্নয়ন কর্মকণ্ডসহ আমাদের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সমন্বিত পরিবেশের যে ক্ষতি করেছি, তা পুনরুদ্ধারের জন্য বিশ্বের সব কটি রাষ্ট্র আগামী এক দশক অবিরত চেষ্টা করবে।

৭. করোনাভাইরাস মহামারির এ অবরুদ্ধ সময়ে নিজের অবস্থানে থেকে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার জন্য কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থপূর্ণভাবে ‘লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম’ কর্মপ্রক্রিয়ায় জড়িত হতে পরিকল্পনা করতে পারি। ধরিত্রীর যত্ন নেওয়া, তত্ত্বাবধান করা, সুরক্ষা করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য আমরা সবাই যার যার নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা, আত্মনিয়োগ ও মেধা অনুসারে জড়িত হয়ে ঈশ্বরের হাতের যন্ত্র হিসেবে সহযোগিতা করতে পারি (লাউদাতো সি, অনুচ্ছেদ ১৪)। আসুন, ধরিত্রীর নিরাময়ে ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তরের এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে আগামী ৭ বছর সময় সক্রিয়ভাবে সাথে থাকি। আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ অবিরত চালিয়ে যাই; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।




রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি

ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পুুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর আহ্বানকে সফলতা দান করতে আগামী ৭ বছর সময়কে "লাউদাতো সি কর্মসূচি প্লাটফর্ম" ঘোষণা করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে, পরিবার, ধর্মপল্লী, পালকীয় সেবা কমিশনসমূহ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, সেমিনারী, ব্রাদার হাউজ, সিস্টারদের কনভেন্ট, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং দলগতভাবে নিজেদের কিছু সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অঙ্গীকার ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে আহ্বান করেছেন।আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে পোপ ফ্রান্সিস এর সর্বজনীন পত্র ‘লাউদাতো সি’ এর অনুপ্রেরণায় করণীয় কিছু উপলব্ধি ও কিছু সুপারিশ এখানে প্রদান করা হল যা নিজেদের জন্য একটি "অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি" তৈরি করতে সহায়তা করবে।

১. নিজের বেদনাদায়ক কষ্ট অনুভব- অন্তরে গভীরভাবে উপলব্ধি করি আবর্জনা এখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলে অপরিচ্ছন্ন-অস্বাস্থ্যকর নর্দমা তৈরি করেছি; গাছ কেটেছি কিন্তু রোপনে অবহেলা করে পরিবেশে ভারসাম্য নষ্ট করেছি; স্বার্থপরতা ও অতিভোগের কারণে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ করে ফেলেছি; প্রতিনিয়ত প্রচুর পানি অপচয় করছি, খাল ও নদীর জল বিষাক্ত করে ফেলেছি; এভাবে প্রকৃতি ও প্রতিবেশীদের প্রতি অনেক ক্ষতি  ইতোমধ্যে করেছি। এসব স্মরণ করে অনুতপ্ত হই ও মন-পরিবর্তন করি  এবং প্রকৃতি ও  প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অঙ্গীকার করে পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর সাথে আধ্যাত্মিকভাবে একাত্ম থাকি। 

২. সৃষ্টির মঙ্গলবার্তা বিশ্বাস- আমাদের আশা হল- ঈশ্বর, যিনি শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি পৃথিবীতেও হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং সব ধরনের অমঙ্গলকে পরাস্ত করতে পারেন। তিনি আমার, আপনার সহযোগিতায় তা করতে চান। আজ থেকেই আমার ও আপনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপে বড় কিছু অর্জন সম্ভব, কেননা আমরা জানি যে পরিবর্তন সম্ভব; এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা;

৩. সৃষ্টি-কেন্দ্রিক উপাসনা প্রস্তুত- যারা পরিবেশ সংরক্ষণ ও বাস্তব্যবিদ্যা গবেষণা করেন তাদের প্রতিপালক আসিসির সাধু ফ্রান্সিস এর মধ্যস্থতায় প্রার্থনা করতে পারি; সৃষ্টি-কেন্দ্রিক বা লাউদাতো সি উপাসনা উদযাপনকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন করা যায়;

৪. পরিবারের যত্ন- আমি যেখানে বসবাস করছি সেটা একটি পরিবার; আমাদের পরিবার হল সৃষ্টি ও প্রকৃতির একটি অংশ; পরিবারের আরো বেশী যত্ন নিব। খাবারের সময়, অবসর সময়ে অথবা বিনোদনের সময়ে প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং দীনদরিদ্রদের অবস্থা নিয়ে সহভাগিতা করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং গরীবদের জন্য ভাল কিছু উদ্যোগ নিতে সন্তানদের উৎসাহিত করা যায়;

৫. তিনটি ‘পি’ (three P’s)- ‘লাউদাতো সি’ পত্রটির নিবিড় সমন্বয় ও কার্যকরী সাড়াদানের ক্ষেত্রে তিনটি ‘পি’ (three P’s) অনুধ্যানে করণীয়সমূহ স্মরণ করতে পারি- plant বা গাছ-গাছড়া লাগানো, protect বা রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও promote বা সংবর্ধিত করা অর্থাৎ ‘লাউদাতো সি’র মাণ্ডলিক শিক্ষা সকলের নিকট প্রকাশ ও প্রচার করা;

. পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা- নিজের দেহ থেকে শুরু করে জামাকাপড়, ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, সমাবেশস্থল, প্রভৃতির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা; সন্তানদেরও অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করবো। বাড়ির চারিপাশের প্লাস্টিক, নর্দমা ও আবর্জনা পরিস্কার করতে উদ্যোগ গ্রহণ ও নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা যায়;

. অপচয়রোধ ও ঋণ পরিশোধ- প্রয়োজন মাফিক কেনাকাটা, পরিমিত রান্না করা; প্রয়োজন অতিরিক্ত খরচপাতি, জিনিসপত্র ও দ্রব্যসামগ্রীর অপব্যবহার, ভোজনবিলাস ও অতি ভোগের মানসিকতা বর্জন করা; বাড়িতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিভিশন, এসি, পানির কল, বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের পর বন্ধ রাখাতে সর্বদা সচেতন থাকব। ক্রেডিট ইউনিয়নসহ সকল প্রকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা; ঋণ গ্রহণ করে বিনোদন বা উৎসব আয়োজন থেকে বিরত থাকা;

. স্বাস্থ্যসম্মত খাবার- শাকসবজি, ফুল ও ফলের বাগান করা এবং খাবারের হিসেবে ব্যবহার করা। প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান করা; মাংস গ্রহণ পরিমিত করা, পরিমিত পরিবেশন ও পরিমিত ভোগ, দেশীয় পণ্য ব্যবহার করার মনোভাব তৈরি করা; 

. বাগান ও জৈবসার- রান্নাঘরের অবশিষ্টাংশ, পাতা-লতা ও আবর্জনাগুলি মিশ্রিত করে উত্তম সার তৈরি করা যায় এবং এসব গাছের বৃদ্ধিতে আরও ভাল সার হিসেবে সহায়তা করে। কর্মস্থলে ও বাড়িতে খালি জায়গায়, টবে, বারান্দা, ছাদে অথবা জানালার পাশে গাছ রোপণ ও নির্ধারিত গাছ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সন্তানদের দায়িত্ব বন্টন করে দিতে পারি। গ্রামের বাড়ির আঙ্গিনায় অথবা শহরে বাসাবাড়িতে টবে বারান্দায় বা ছাদে অথবা জানালার পাশে শাক-সবজি-ফুল বাগান তৈরি করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা; 

১০. দূষণমুক্ত পরিবেশ- শব্দ, বায়ূ, জল এবং সকল প্রকার দূষণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা; গণপরিহন ব্যবহার করা এবং পরিবহণের দূষণকারী কর্মক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে; 

১১. পানি অপচয়রোধ- যারা পানীয় জলের চরম সংকটে আছে তাদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে আমরা  স্নানে পরিমিত পানি ব্যবহার বা আগের চেয়ে একটু কম পারি ব্যবহার, হাতমুখ ধোয়ার সময় কলের পানি নষ্ট না করি, যতটুকু পান করতে চাই ততটুকু পানি গøাসে ঢেলে পান করতে পারি। আমাদের এমন ক্ষুদ্র ক্ষ্রদ্র অভ্যাস পানি অপচয় অনেক হ্রাস করবে; 

১২. প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা- আমরা এমুহূর্তে প্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারছি না তাই সঠিকভাবে ব্যবহার ও প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পলিথিন ব্যাগ একেবারেই বাদ দিতে হবে কারণ এর ক্ষতির ধরন বহুমাত্রিক এবং বাড়ছে- মাটি নষ্ট করে জমিতে ফসল উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করছে, শহরে নর্দমা বের হওয়ার পথ বন্ধ করে ব্যাপক ক্ষতি করছে এবং আগুনে দিলে গ্যাস হয়ে বায়ুদূষণ করে মানবদেহের সংঘাতিক ক্ষতি করবে; 

১৩. কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহার- পাটের তৈরি চটের ব্যাগ অথবা ভারী ও শক্ত কাপড় পুনঃব্যহার করে ব্যাগ তৈরি করে বাজারে বা বাড়ির নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়;

১৪. পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা- লাউদাতো সি পত্রটির অনুপ্রেরণায় সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক শিক্ষা বিস্তার করা সম্ভব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ডাইয়োসিস, ধর্মপল্লী, ক্লাব, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, পরিবারে, যোগাযোগ মাধ্যমে, ধর্মশিক্ষাদানে ও অন্যত্র। পরিবেশগত সচেতনতা এবং কর্মকাণ্ড তৈরি লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবেশগত চেতনায়নমূলক শিক্ষা পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করােত পারে; 

১৫. পরিবেশ বিষয়ক বই ও পত্রিকা পড়া- ব্যক্তিগতভাবে এবছর পরিবেশ বিষয়ক একটি বই পড়ার অঙ্গীকার করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের গ্রাহক হয়ে পাঠ করা; লাউদাতো সি বিষয়ক একটি শিক্ষা সেমিনারে অংশগ্রহণ করা; যা যা নতুন শুনছি তার কিছু অংশ মনে রাখুন। আমরা যা শুনি তার মাত্র ১০ শতকরা এক বছর পর মনে রাখতে পারি। আগ্রহ অটুট থাকলে মনে রাখার শতকরা হারও বাড়বে;

১৬. অভিজ্ঞ সহায়ক নিমন্ত্রণ- আপনার সংঘের, বা প্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহণকারী অংশীজনের সাথে আপনার শিক্ষণ সহভাগিতার ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে আপনাকে সহায়তা করতে বাইরে থেকে অভিজ্ঞ সহায়ক বা বক্তা ডেকে আনুন;

১৭. নিজে জানুন ও অন্যকে জানান- আমাদের দেশে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে সরকার কাজ করছে, দেশী সংস্থা কাজ করছে, বিদেশী সংস্থা কাজ করছে। তাদের কাজ সম্পর্কে জানা ও অপরকে জানানো, তাদের কাজে সহযোগিতা করা। প্রকৃতি ও পরিবেশ বা লাউদাতো সি বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জোটে (হবঃড়িৎশরহম) যোগ দিন; নিজের চেষ্টায় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ, ফলাফল ও প্রতিরোধ সম্পর্কে আরো বেশী করে জানুন। পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে মণ্ডলীর শিক্ষা কী, মহামান্য পোপ মহোদয় বার বার কী আহবান রাখছেন- তা জানুন;

১৮. একজনকে দায়িত্ব প্রদান- আপনার সংঘে বা প্রতিষ্ঠানে এমন একজনকে বাছাই করুন যে কী না আপনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আগামী বছর এই বিষয়ে নিজে আরো জানবেন, সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের সকলকে জানাবেন ও বাইরে অন্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন; 

 ১৯. সহভাগিতা ও আলোচনা- আপনার যা যা নতুন শিক্ষণ (learning) তা তা আপনার সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার অংশীজনদের (stakeholders) জানান। যেসমস্ত চিঠি, দলিল, লেখা পাচ্ছেন তা সহভাগিতা করা, তাদের কেন জানাচ্ছেন তা-ও ব্যাখ্যা করুন। আপনার প্রত্যাশা খুলে বলুন। কোনো নিয়মিত সভায় সকলের সাথে এই বিষয় আলাপ করতে ঘন্টাখানেক সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে;

২০. কর্মস্থলে সচেতনতা- কর্মস্থলে প্রয়োজন ছাড়া কাগজে প্রিন্ট না করা, প্রয়োজনে কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট করা এবং সুযোগ থাকলে কাগজ পুনঃব্যবহার করতে পারি; কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য অফিস সরঞ্জামসমূহ ব্যবহারের পরে বন্ধ রাখব; দলীয়ভাবে গাড়ী ব্যবহার করার মাধ্যমে কার্বন ব্যবহার হ্রাস করতে পারি; 

২১. সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ- কর্মস্থলে ‘ধন্যবাদ’ ও ‘স্বাগত’ এমন সৌজন্যসূচক শব্দ ব্যবহার, ইতিবাচক কথা বলা, ইতিবাচক শব্দ ব্যবহার, নোংরা শব্দ পরিহার, সমালোচনামূলক কথা না বলা, বিচারকি কথা-বার্তা পরিহার কর্মপরিবেশ সুন্দর রাখে। অযাচিত চাটুকারিতার স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা; কাজের সময় অযথা অন্যের নিকট বসে সময় নষ্ট না করা বরং তাকে কাজ করতে দেয়া এবং নিজে ভাল কাজ করা, কাজে সৃজনশীল চিন্তা করা, অবসর সময়ে উদ্দীপনামূলক লেখা পড়ে নতুন চিন্তা আহরণ করা; 

২২. সত্য মতকে সত্যরূপে গ্রহণ- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিত্তিহীন গুজব ও ‘মতের অরণ্য’ থেকে  বেরিয়ে এসে মূলধারার গণমাধ্যমের উপর নির্ভর করা যেন যথার্থ আনন্দ, গভীর তৃপ্তি, প্রকৃত সত্য আহরণ করা যায়;

২৩. ছুঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি বর্জন- অর্থনীতি, উৎপাদন ও জিনিসপত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে- সংগ্রহ কর-চাহিদা পূরণ কর-ছুঁড়ে ফেলার (take-make-dispose) বর্তমানযুগে প্রচলিত উন্নয়নের মডেলের পরিবর্তে লাউদাতো সি'র অনুপ্রেরণা- পুনর্নবীকরণ-পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ-অন্যের সাথে সহভাগিতার (renew-remake-share) রূপান্তরশীল প্রক্রিয়া প্রচলন ও অনুুসরণ করা;

২৪. পবিত্র আহ্বান হিসেবে গ্রহণ- নিজের কল্যাণের কথা ভেবেই প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশীর সুরক্ষা সুসংবাদটি পবিবারের আপনজন ও বন্ধুবান্ধবদের জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই এটি পবিত্র একটি আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করা যায়;

২৫. নিজের অংশগ্রহণটা অপরিহার্য- ইতোমধ্যে যদি ভাল কিছু করি তবে 'আরো ভাল' কিছু করতে চেষ্টা করি, যদি আরো ভাল কিছু করে ফেলেছি তবে 'উত্তম কিছু' করতে চেষ্টা করি, আর যদি উত্তম কিছু করে থাকি তবে 'অতি উত্তম কিছু' করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারি;

২৬. অবিরত প্রার্থনা করি- যদি কিছুই করতে না পারি তবে পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে সরাসরি যারা জড়িত তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তেনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের জন্যেও প্রার্থনা করুন। দীনদরিদ্র মানুষ যারা অমানবিক ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন তাদের জন্য প্রার্থনা অব্যাহত রাখুন। এই বিশ্ব জানতেও পারেনা প্রার্থনায় যে কতো আশ্চর্য্য কাজ হয়!     

করোনাভাইরাস মহামারী শিখিয়েছে আমাদের আরও বেশি যতœবান ও রক্ষণাবেক্ষণ মনোভাব প্রয়োজন। পোপ মহোদয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা ‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ উদ্যাপন করছি। ইতোমধ্যে অনেকে নীরবে কাজ করে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেছি। ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পোপ ফ্রান্সিসের এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে আগামী ৭ বছর অবিরত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করবে। আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ "অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি" অনুসরণ করি তবেই মহান কিছু অর্জন সম্ভব হবে। ধরিত্রীর বুকে আনবে নতুন ছন্দ, জাগাবে নতুন আশা; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।



 পঞ্চাশত্তমী মহাপর্ব দিবস, রবিবার,  মে ২৩, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, লাউদাতো সি সপ্তাহ-২১

বুধবার, ১৯ মে, ২০২১

অধ্যয়ন, অনুধাবন ও অনুশীলন

 খ্রিস্টমণ্ডলীর কর্মনীতি বা কর্মকৌশল হলো  সদ্বিবেচনা বা বিবেক। সদ্বিবেচনা এমন একটি নৈতিক গুণ যা মঙ্গল-উদ্দেশ্য ও সঠিক পদ্ধতি জানার জন্য সাহায্য করে। সদ্বিবেচনার প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ লক্ষ্যণীয়: (ক)  পরিস্থিতি জানা - “দেখা” (খ) যাচাই করা বা শুনা বা বিশ্লেষণ করা এবং (গ) কাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া  বা কাজ করা।  সদ্বিবেবচনা এমন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে যা সঙ্গতিপূর্ণ, বাস্তবধর্মী ও দায়িত্বশীল।‌ আমরা যখন ‌'লাউদাতো সি সপ্তাহ -২১' পালন করছি তখন নিম্নের বিষয়সমূহ নিজেরা গভীরভাবে অনুধাবন এবং অনুশীলন  করে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার জন্য কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সপ্তাহটি অর্থপূর্ণ করতে পারি। 

(১) পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা- নিজের দেহ থেকে শুরু করে পোশাক-আশাক, ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, সমাবেশস্থল, প্রভৃতির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা; 

(২) অপচয়রোধ- প্রয়োজন অতিরিক্ত খরচপাতি, জিনিসপত্র ও দ্রব্যসামগ্রীর অপব্যবহার, ভোজনবিলাস ও অতি ভোগের মানসিকতা বর্জন ; 

(৩) দূষণমুক্ত পরিবেশ- শব্দ, বায়ূ, জল এবং সকল প্রকার দূষণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা; গণপরিহন ব্যবহার করা এবং পরিবহণের দূষণকারী কর্মক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে; 

(৪) স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ- শাকসবজি, ফুল ও ফলের বাগান করা এবং খাবারের হিসেবে ব্যবহার করা। প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান করা; মাংস গ্রহণ কমানো, পরিমিত পরিবেশন ও পরিমিত ভোগ, দেশীপণ্য ব্যবহার;

 (৫) সত্য মতকে সত্যরূপে গ্রহণ- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিত্তিহীন গুজব ও ‘মতের অরণ্য’ থেকে  বেরিয়ে এসে মূলধারার গণমাধ্যমের উপর নির্ভর করা যেন যথার্থ আনন্দ, গভীর তৃপ্তি, প্রকৃত সত্য আহরণ করা। সকলে সত্য মতকে অবিচল সত্যরূপে গ্রহণ করতে পারলে নানা প্রকার বিদ্রোহ, বিভ্রাট ও মনোবিকার যার ফলে সৃষ্ট এক ধরণের মানসিক আর্বজনা থেকে সমাজ রক্ষা পাবে এবং

(৬) ছুঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি বর্জন- অর্থনীতি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে সংগ্রহ কর-চাহিদা পূরণ কর-ছুঁড়ে ফেলার (Take-Make-Dispose) বর্তমানযুগে প্রচলিত উন্নয়নের মডেলের পরিবর্তে লাউদাতো সি'র অনুপ্রেরণা- পুনর্নবীকরণ-পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ-অন্যের প্রয়োজনে সহভাগিতার (Renew-Remake-Share) রূপান্তরশীল প্রক্রিয়া প্রচলন ও অনুুসরণ করা। 

আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ অবিরত চালিয়ে যাই; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।



শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ - মে ১৬-২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

 LAUDATO SI WEEK 21, May 16-25, 2021

পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার উপর মে ২৪, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ‘লাউদাতো সি’ সর্বজনীন পত্রটি লিখেছেন। তাঁর আহ্বানে ‘লাউদাতো সি বছর’ (মে, ২০২০ থেকে মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ) পালনের সমাপ্তিতে মে ১৬-২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ তারিখে ‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ উদযাপন হতে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারির এ অবরুদ্ধ সময়ে নিজের অবস্থানে থেকে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার জন্য কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থপূর্ণভাবে সপ্তাহটি উদযাপন করতে পারি। যেমন-

১. আমাদের জীবনযাপনে অপরিহার্য উপাদান (মাটি, বায়ু, আগুন, জল) নিয়ে গভীর মনোযোগ প্রদান করতে পারি; কিন্তু এসবই
এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন এবং আমাদের সকলকেই ভাবিয়ে তুলছে; আমরা সবাই ভুক্তভোগী;

২. দীনদরিদ্র, দুর্বল ও দুঃখকষ্টে জর্জরিত মানুষের আর্তনাদে আরও অধিক মনোযোগ দিতে পারি;

৩. একটি আরও ন্যায়-সঙ্গত, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই অর্থনীতির প্রতি মনোযোগ দিতে পারি যা কাউকে পিছনে
ফেলে রাখে না;

৪. সহজ-সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ-জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কিছু কিছু বিষয়ে সচেতনতা লাভ করা যায়- (ক)
পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, (খ) অপচয়রোধ, (গ) দূষণমুক্ত পরিবেশ, (ঘ) প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান
করা;

৫. আমাদের অভিন্ন উৎপত্তি সম্বদ্ধে, আমাদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে এবং সম্পদসমূহ সবার সাথে সহভাগিতা করার
দায়িত্ব সম্বদ্ধে পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা, জ্ঞান ও সচেতনতা গ্রহণ করতে পারি;

৬. ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রকৃতির ধ্যানমগ্নতায় বিস্ময়বোধ, প্রশংসা, আনন্দ এবং কৃতজ্ঞতা অন্তরে অবিরত অনুভব করা; সৃষ্টি-কেন্দ্রিক
উপাসনা উদযাপনকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন
করা যায় এবং

৭. এ সংকটকালে একযোগে এই ধরিত্রীকে বাঁচানোর চিন্তায় মনোযোগী হওয়া ও অংশগ্রহণমূলক বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ খুবই
প্রাসঙ্গিক ভাবনা।
আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ অবিরত চালিয়ে যাই; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।



শুক্রবার, ২ এপ্রিল, ২০২১

খ্রিস্ট জীবন্ত : আমাদের আশা, আমাদের মনোবল

১. পুনরুত্থান পর্বের প্রস্তুতিতে আমরা ধ্যান করতে চেষ্টা করেছি- যিশু খ্রিস্ট আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন উপবাস, প্রার্থনা এবং দান কর্ম আমাদের মন পরিবর্তনকে সম্ভব ক’রে তোলে, অন্যদিকে এসব আমাদের মন পরিবর্তনের চিহ্নও (মথি ৬:১-১৮)। উপবাসের মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত হই, প্রার্থনায় অন্তরে আশার আলো দেখতে পাই এবং দান-কর্মে মাধ্যমে ‘যত্নের সংস্কৃতি’ চর্চা করতে পারি। ফলে নিজে রূপান্তরিত হয়ে অন্যকে রূপান্তরিত হতে অনুপ্রাণিত করি। জীবনযাপনে প্রার্থনা, ধ্যান, উপাসনা ও সংস্কারীয় জীবনের প্রতি অনুরাগ ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে; খ্রিস্টিয় বিবাহ, যাজকীয় ও সন্ন্যাসব্রতী জীবনের আহ্বান সম্পর্কে নবচেতনা ও নবজাগরণ ঘটবে; ধর্মশিক্ষা গ্রহণে ও দানে নিষ্ঠতা বাড়বে; সামাজিক জীবনের সম্পৃক্ততা বাড়বে; দয়াকর্ম, সাংস্কৃতিক ও আধ্যত্মিক কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন উদ্যোগ ও চেতনা সৃষ্টি হবে এবং খ্রিস্টবিশ্বাসে যাদের স্খলন ঘটেছে, তারা আবার খ্রিস্টীয় জীবনে ও মণ্ডলীর মিলন-সংযোগে ফিরে আসে। ফলে আমাদেরকে নিখাঁদ বিশ্বাস, জীবন্ত আশা এবং কার্যকরী দানশীলতার জীবন যাপনে সমর্থ ক’রে তোলে।

২. এ বছরের পুনরুত্থান পর্বটিও আমাদের নিকট যিশুর প্রথম শিষ্যদের অভিজ্ঞতার মতোই। করোনাভাইরাসের 'ধ্বংস ও মৃত্যুর আক্রমণ' দুর্বল হয়েও আবার নতুনভাবে সংক্রমণ শুরু ফলে সাধারণ জনগণের মনে অনিশ্চয়তা ও সংশয় বাড়ছে। যিশুর মৃতদেহ সমাধিগুহায় শুইয়ে রেখে শিষ্যদের কারও কারও মনের মধ্যে অনিশ্চয়তা, সংশয় ও সন্দেহ ছিল (মথি ২৮: ১৭)। তবে কয়েকজন নারীর একটি ক্ষুদ্রদল সক্রিয় ছিল; যিশুর মৃত্যু তাদেরকে হতাশায় পঙ্গু করে ফেলেনি। বরং তারা একটি সাধারণ কাজ অসাধারণভাবে করেছে। তারা যিশুর পবিত্র দেহে গন্ধদ্রব্য লেপনের কাজটি আরও সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার জন্য সুগন্ধি-মশলা প্রস্তুত করে নিয়ে এসেছে। গত বছর নিস্তার জাগরণীর অনুধ্যানে পোপ ফান্সিস বলেছেন- "তারা তাদের ভালবাসার দুয়ার বন্ধ করে রাখেনি; তাদের অন্তরের অন্ধকারে দয়ার শিখা প্রজ্জলিত রেখেছে।" আমাদের ভাবতে হবে- আমাদের জীবনের অশ্চিয়তা, সংশয় ও সন্দেহের মুহূর্তে আমরা কি ভয়ে ভালবাসার দূয়ার বন্ধ রেখেছি? অভাবী ও বিপদাপন্ন ভাইবোনদের সেবাযত্নের জন্য আমি কীভাবে গন্ধদ্রব্য, সুগন্ধি-মশলা নিয়ে প্রস্তুত আছি?

৩. যিশুকে সমাধিগুহায় রেখে যিশুর মা একটি নতুন সূর্যকিরণ, একটি নতুন দিন দেখার আশা নিয়ে প্রার্থনারত সময় কাটিয়েছেন। তিনি আজ আমাদের সকলের 'মা' । পোপ মহোদয় একটি অনুধ্যানে বলেছেন- “যিশুর দেহটি মাটিতে  শোয়ানো বীজ যিনি পৃথিবীকে নতুন জীবন দান করবেন এবং মা মারীয়া প্রার্থনা ও ভালবাসা দ্বারা এই আশাটি প্রস্ফুটিত হতে সহায়তা করেছেন।” প্রার্থনা আমাদের জন্য একটি অন্যতম আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য যা বিভিন্ন সময় অভিজ্ঞতা করছি। একটি অন্ধকার ও বিরক্তকর অভিজ্ঞতা যা আমাদের কাছে অভিশাপের মত হতে পার। ঐ মুহূর্তে প্রার্থনা আমাদের জীবনে গভীর অভ্যন্তরীণ রূপান্তর আনে, শান্তির সূচনা করে। এমন কী কিছু সময় পরে অপ্রত্যাশিত আনন্দ ও আর্শীবাদের অভিজ্ঞতা করতে পারি। এই অবরুদ্ধ সময়ের দুর্গতিতে আমারা চিন্তা করি- আমরা কতটা সময় প্রার্থনায় কাটিয়েছি, আমরা কতটুকু আশা ও মনোবল নিয়ে মা-মারীয়ার মত সবকিছু নতুন স্বাভাকিতায় গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়ে আছি? পরিবারে কীভাবে প্রার্থনারত জীবনযাপন করছি?

৪. এই দিনেই ‘আশা’ পৃথিবীতে প্রবেশ করে। যিশুর সাথে নারীদলটির সাক্ষাৎ ঘটে। তারা বুঝেছেন যিশুর মৃত্যু তাঁর মহিমা-লাভের সোপান মাত্র। যিশুর কথা শুনে তাদের অন্তরে আশা ও মনোবল আগুনেরই মতো আবার জ্বলে উঠেছে।  পোপ ফান্সিস বলেছেন- “ভয় করো না, ভয় পেও না -এই আশার বার্তাটি আজ আমাদের কাছেও এসেছে। একই বাক্য ঈশ্বর আমাদের জন্য দিয়েছেন।” পোপ মহোদয় আরো বলেছেন- “আশা করাটা আমাদের অধিকার। ভোরের আলোর সাথে সাথেই ‘আশা’ পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে।” একদল নারীই 'আশা'র বার্তাটির প্রথম দূত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। এটি নৈরাশ্যের হাত থেকে আমাদের উদ্ধারের এক বার্তা, আমাদের মনে কি আনন্দ, কি ভক্তির উচ্ছ¡াস- কীভাবে তা প্রকাশ করছি? অতিভোগ, অতিউৎসব, অতিপরিবেশন ও পানাহার অথবা আমাদেরকে নিখাঁদ বিশ্বাস, জীবন্ত আশা এবং কার্যকরী দানশীলতার জীবন যাপনে সমর্থ ক’রে তোলচ্ছে। 

৫. পুনরুত্থানেরই একটি ঐশদান- 'আশা'। সবকিছুর শেষে অশুভকে পরাজিত করে শুভ জয়ী হবে এমন আশাবাদ এটি নয়। বরং এটি পিতা ঈশ্বরের কাছ থেকে আগত অনুগ্রহদান ‘আশা’। এটি একটি ঐশদান যা আমরা নিজেরা অর্জন করিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা বলে থাকি আগামী সপ্তাহ বা কয়েকদিনের মধ্যে করোনাভাইরাস বাহাদুরি সব ঠিক হয়ে যাবে। মনে করতে শুরু করেছি সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এসেছে কিন্তু বিগত সপ্তাহগুলোতে আমরা অভিজ্ঞতা করেছি, সময় অতিবাহিত হয়েছে তথাপি আমাদের এমন আশাবাদ অর্থহীন প্রমাণিত। যিশুর প্রদত্ত আশা ভিন্ন সংবাদ দেয়। তিনি আমাদের অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস দিয়েছেন, ঈশ্বর সমস্ত কাজের সমাপ্তিতে ভালো কিছু সমাধান দিবেন। কারণ ‘কবর’ থেকেও তিনি ‘জীবন’ ফিরিয়ে এনেছেন। এই দুর্যোগের পরে পরিবেশ আরো ভাল হবে, তিনি আমাদের পরিচালনা করবেন। “ঈশ্বর যিনি শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি পৃথিবীতেও হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং সব ধরণের অমঙ্গলকে পরাস্ত করতে পারেন। অন্যায্যতা অজেয় নয়” (লাউদাতো সি - ৭৪)। অফুরন্ত আশা, গভীর বিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে পিতা ঈশ্বরে দান গ্রহণে অপেক্ষা করি। প্রার্থনা, দয়াকাজ ও ত্যাগম্বীকারের মাধ্যমে আমাদের বিশ্বাস, আশা ও ভালবাসা নবায়িত হতে দেই। 

৬. পোপ ফ্রান্সিস অনুধ্যানে বলেছন- “তিনি হৃদয়ের পাথরও সরিয়ে দিতে পারেন। একটি কবর থেকেই জীবন আবির্ভূত এটাই আমাদের আশা। যিনি এমন এক স্থান থেকে আবির্ভূত হয়েছেন, সেখান থেকে কেউ কখনও আবির্ভূত হয়নি- এটি কবর। যিনি সমাধির প্রবেশদ্বার বন্ধ করার পাথরটি সরিয়ে দিয়েছেন, এই দুর্যোগ সময়ে তিনি আমাদের ভারাক্লান্ত হৃদয়ের পাথরও সরিয়ে দিতে পারেন।” তিনি আমাদের ত্যাগ করেননি, তিনি আমাদের সাথে আবার সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি আমাদের বেদনা, যন্ত্রণা এবং মৃত্যুর মধ্যে প্রবেশ করেছেন। তাঁর আলো সমাধির অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, আজ তিনি চান সেই আলো আামদের জীবনের অন্ধকারময় স্থানেও প্রবেশ করুক, কৃষ্ণকালো মেঘে ঢাকা বিশ্বেকে (দ্রষ্টব্যঃ ফ্রাটেল্লি তুত্তি) আলোকিত করুক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে অস্বস্তিকর ও গুরভার দুশ্চিন্তা জয় করা য়ায়- “শান্ত-সমাহিত অনুভূতি নিয়ে জীবনকে দেখা, প্রতিটি মুহূর্তকেই ঈশ্বরের দান বলে গ্রহন করা (লা. সি.- ২২৬)। আমরা নিজেদের সমস্যার পাথর সরিয়ে দিতে খ্রিস্ট যিশুর অনুগ্রহ প্রার্থনা করি, বারে বারে তাঁকে অনুরোধ করি, তিনি আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না। ‘ফ্রাটেল্লি তুত্তি’ প্রৈরিতিক পত্রে পোপ ফ্রান্সিস বাইবেলে বর্ণিত দয়ালু সামারীয়র উপমা কাহিনী ধ্যান করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন- আমরা যা অভিজ্ঞতা করি, এই কাহিনী তার মধ্যে একটা উজ্জ্বল আলোকরশ্মির মতো বিরাজ করছে। এই উপমা কাহিনী আমাদের স্মরণ ক’রে দেয় যে, পরিবারে যে স্বাভাবিক ভালোবাসার অভিজ্ঞতা হয়- তা আমরা অচেনা মানুষদের প্রতিও দেখাতে পারি। এই ভালোবাসা আমরা ব্যক্তিগতভাবে এবং সামাজিকভাবে প্রকাশ করে পরিবারভূক্ত হয়ে উঠতে পারি। ভ্রাতৃবোধ ও সামাজিক বন্ধুত্ব নবায়ন করে আমরা একে অন্যের হৃদয়ের পাথর সরিয়ে দিতে পারি।

৭. দুর্গতিতে ‘মনোবল’ পুনরুত্থানের একটি অনুগ্রহদান। আমাদের হৃদয়ে রাখা পাথরটি সরিয়ে দিয়েই আমরা যিশুর মনোবল গ্রহণ করতে পারি। পুনরুত্থিত খ্রিস্ট আমাদের মনের গভীরের ভয়টি অনুভব করতে পারেন। পোপ মহোদয় বলেছেন- “খ্রিস্ট আমাদের সাহস দিচ্ছেন, তিনি আমাদের জীবন এবং আমাদের মৃত্যুতেও আমাদের সামনেই চলছেন। তিনি আমাদের আগে গালিলেয়া যাচ্ছেন,  সেখানে তাঁর ও শিষ্যদের প্রতিদিনের জীবন, পরিবার ও কাজের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কাজ-কর্মে আশা নিয়ে আসতে চান।” শিষ্যদের জন্য গালিলেয়া স্মৃতিময় স্থান কারণ এখানেই তাদের প্রথম আহ্বান করেছেন। গালিলেয়া ফিরে আসার অর্থ তিনি আমাদের প্রথম ভালবেসেছেন ও আহ্বান করেছেন। রবিবার হচ্ছে পুনরুত্থানের দিন, নতুন সৃষ্টির “প্রথম দিন” যেখানে ঈশ্বরের সাথে, নিজের সাথে, অপরের সাথে ও বিশ্বসৃষ্টির সাথে আমাদের সম্পর্ক নিরাময় হয় (লা.সি.- ২৩৭)। আমরা স্মরণ করি- প্রথমবার কোথায় যিশুর আহ্বান পেয়েছি, প্রথমবার কখন বুঝেছি তিনি আমার পাশেই আছে, প্রথমবার যখন খ্রিস্ট প্রসাদ গ্রহন করেছি তখনকার অভিজ্ঞতা স্মরণ করি এবং আজও এ দুর্গতিতে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করি।

৮. তিনি আমাদের আজ জগতের সর্বত্র প্রেরণ করছেন (মথি ২৮:১৯)। পোপ মহোদয় বলেছেন- “তিনি আমাদের শুধু পবিত্র স্থান গালিলেয়া নয় বরং পৃথিবীর সর্বত্র প্রেরণ করছেন।  আমরা যেখানে বসবাস করি সেখানেই তিনি আমাদের প্রেরণ করছেন।” তিনি চান তাঁর প্রতি বিশ্বাসী যারা সকলের নিকট আমরা ‘জীবনের মঙ্গলবার্তা’ পৌঁছে দেই। আমরা যারা জীবন বাণী অভিজ্ঞাতা করেছি তারা যদি জীবনের কথা না বলি তবে কে বলবে? খ্রিস্ট জীবন্ত। “তিনি কখনো আমাদের প্রত্যাখ্যান করেন না, তিনি আমাদেরকে একা ফেলে রেখে যান না, কেননা তিনি নিশ্চিতরূপে আমাদের এই পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন এবং তাঁর সেই ভালবাসা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পন্থা খঁজে পাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দান করে” (লা. সি.- ২৪৫)। আসুন, এই যাত্রা পথে আমরা সুর মিলিয়ে গান করি। আমাদের এই কষ্টের যাত্রা, আমাদের এই সংগ্রামের যাত্রা যেন প্রত্যাশিত আনন্দ বিনষ্ট করতে না পারে। তিনিই আমাদের আশা, তিনিই আমাদের মনোবল। জয় মৃত্যুঞ্জয়, জয় তোমারই জয়।




প্রকাশিত: সাপ্তাহিক প্রতিবেশী, সংখ্যা ১২, ৪-১২ এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ



সোমবার, ৮ মার্চ, ২০২১

কারাবন্দিদের মঙ্গলবার্তা


১. গতবছর পুণ্য শুক্রবারে ধর্মগুরু পোপ ফান্সিস কারাবন্দিদের সাথে আধ্যাত্মিক একাত্মতায় ক্রুশের পথ ধ্যান করেছেন। পোপ মহোদয় যিশুর ক্রুশের পথ অনুধ্যান লেখার জন্য আঠারোজনকে আমন্ত্রণ করেছেন। তারা নিজের জীবন অভিজ্ঞতা অনুধ্যান করেছে। আমন্ত্রিতদের মধ্যে পাঁচজন বন্দি, একটি পরিবার যারা হত্যার শিকার হয়েছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত একজন বন্দির কন্যা, কারাগারের একজন শিক্ষক, একজন সিভিল ম্যাজিস্ট্রেট, একজন বন্দির মা, একজন কারা ধর্মশিক্ষক, একজন  স্বেচ্ছাসেবক, একজন কারারক্ষী এবং একজন যাজক যিনি আট বছর বন্দি থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কারা অন্ধকারে থেকেও ভাল চোরের মত খ্রিস্টকে অভিজ্ঞতা করার ফলে এক মুহূর্তে জীবন আলোতে উদ্ভাসিত হতে পারে। ঈশ্বরে যাদের অগাত বিশ্বাস, পবিত্র আত্মার প্রদত্ত আশায় যারা পথ চলে তারাই হৃদয় গভীওর ভালবাসার আলোটি দেখতে পায়। এমনকি কারা অন্তরীণে অন্ধকারেও একটি আশার বাণী শোনতে পায়  “কারণ পরমেশ্বরের অসাধ্য কিছুই নেই” (লুক ১:৩৭)। আসুন তাদের খ্রিস্ট যিশুর অভিজ্ঞতা শুনি। 

২. যাবজ্জীবন কারদণ্ড প্রাপ্ত একজন বন্দি ২৯ বছর যাবৎ কারা অন্তরীণে। তার অনুধ্যান- যখন আমাকে আদালত কক্ষে আনা হয়েছে তখন 'ওকে ক্রুশে দাও, ক্রুশে দাও' এ চিৎকার শুনেছি। আবার খবরের কাগজ ও টেলিভিশন সংবাদে একই শ্লোগান আমি শুনতে পেয়েছি। আমি দোষী আর যিশু নির্দোষ ছিলেন। বাবার সাথে আমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত আছি। কিন্তু শৈশবে চলার পথে পাবলিক বাসে, শ্রেণিকক্ষে ধণীর ছেলেরা আমাকে ক্রুশবিদ্ধ করেছে দিনের পর দিন কারণ আমি গরীব। তাদের দ্বারা আমি মানসিক নির্যাতদের শিকার হয়েছি, আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তারা অভিযুক্ত হয়নি, তাদের দণ্ড হয়নি। স্বাস্থ্যগত কিছু সমস্যা ছিল তাই প্রচুর অবজ্ঞা পেতে হয়েছে। তাই শৈশব থেকেই আমি ক্রুশবিদ্ধ। যিশুর যাতনাভোগের কাহিনী পড়ে ২৯ বছর পরেও আমি চোখের জল ফেলে কাঁদতে পারি। আমার সৌভাগ্য- আমার চোখের জল শেষ হয়ে যায়নি, লজ্জাবোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলিনি। যিশুর ক্রুশ যাতনাভোগ কাহিনী পড়ে আমি কখনও নিজেকে বারাব্বাস, কখনও পিতর এবং কখনও যুদাস অনুভব করে থাকি। কৃষ্ণকালো মেঘের পরে কররদ্রোজ্জ্ব দুপুরের আশায় জীবন এখনও প্রবাহমান। আমি খ্রিস্ট যিশুর সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে চাই (২করি. ৫:২০)।

৩. একটি পরিবারের মা যাদের মেয়ে নির্দয়ভাবে হত্যার শিকার হয়েছে। সে অনুধ্যান করেছে- অন্যমেয়েটি কোনোভাবে প্রাণ রক্ষা  পেয়েছে কিন্তু মিষ্টি হাসি বিনষ্ট করে দিয়েছে। খুনী এখন কারাগারে বন্দি। সময় চলে যায় কিন্তু ক্রুশের ভার কমে না। কন্যাকে ভুলতে পারি না, সে আমার সাথে থাকতে পারত কিন্তু এখন নেই। আমরা এখন বৃদ্ধ, বাড়িতে দিন দিন বিপদাপন্ন সময় আসছে। তবে হতাশাগ্রস্থ সময়ে যিশু বিভিন্ন উপায়ে আমাদের কাছে এসেছেন। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে আরো ভালবাসতে, আরো সমর্থন করতে অনুগ্রহ পেয়েছি। যিশু আমাদের বাড়ির দরজা দরিদ্র ও হতাশাগ্রস্থদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে আহ্বান করেন। আমরা সাড়া প্রদান করি, আবার মানবকল্যাণ কাজ করতে শুরু করি। আমরা মন্দের কাছে আত্ম-সমর্পণ করতে চাই না। দয়া কাজের মাঝে বারে বারে মেয়েকে খুঁজে পাই। ঈশ্বরের ভালবাসায় সত্যই জীবন পুনর্নবীকরণ সম্ভব। তাঁর পুত্র যিশু মানুষের দুঃখ লাঘব করতে যন্ত্রণা সহ্য করেছেন।

৪. একজন বন্দি যিশুর মাটিতে পতন অনুধ্যান করেছে- আমার প্রথম পতনটি আমি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলাম; পৃথিবীতে ভাল বলতে কিছু আছে বুঝিনি। দ্বিতীয়টিতেও আমি বুঝিনি খুনের একটি পরিণতি আছে কারণ আমি ইতিমধ্যে বিবেকের ভিতরে মারা গিয়েছি। আমি বুঝতে পারিনি ধীরে ধীরে আমার ভিতরেও মন্দতার ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষ্ণকালো অন্ধকার মেঘ আমার জীবনকে ঘিরে ফেলেছে এবং যখন-তখন ভয়ানক টর্নেডো হানা দিতে যাচ্ছে। ক্রোধ আমার দয়াশীলতা মেরে ফেলে, আমি জঘন্য মন্দ কাজ করে ফেলি। কারাগারের অন্যের খারাপ আচরণ আমাকে আত্ম-বিশ্লেষণ করতে শেখায়- আমার পরিবারকে আমি নষ্ট করে দিয়েছি। আমার কারণে তারা সুনাম, সম্মান ও মানবিক মর্যাদা হারিয়েছে। আমার পরিবার এখন ‘খুনির পরিবার’। এখন আমার শাস্তিটি শেষ পর্যন্ত ভোগ করতে চাই। কারণ কারাগারে আমি এমন লোকদের খুঁজে পেয়েছি যারা আমার বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি অতিশয় অপরাধী জেনেও দেখতে আসে, আশার কথা শুনায়, আমাকে ভালবেসে আলিঙ্গন করে ও খ্রিস্টকে গ্রহণ করতে সুযোগ করে দেয়।

৫. অন্য একজন বন্দির অনুধ্যান- আমার প্রথমবার পতন হয়েছে যেদিন মন্দ আমাকে আকৃষ্ট করেছে, মাদকদ্রব্যগুলো বাবার প্রতিদিন ১০ ঘন্টা পরিশ্রমের চেয়ে বেশী মূল্যবান ছিল। দ্বিতীয় পতন ছিল- যখন পরিবারকে ধ্বংস করেছি। মা এখন তার ছেলেকে দেখতে আসে, কিন্তু বন্দিকে নয়, মায়ের এমন মন আগে বুঝিনি। এখন বুঝতে শিখেছি, মায়ের চোখে তাকিয়ে দেখেছি মা সমস্ত লজ্জা নিজে গ্রহণ করেছে। বাবার মুখে তাকিয়ে দেখেছি বাবা গোপনে ঘরে একা বসে কেঁদে কেঁদে সময় পার করছে। 

৬. একজন বন্দির মায়ের অনুধ্যান- আমার ছেলের পাপের জন্য আমি নিজে দোষী। আমি আমার নিজের দায়বন্ধতার জন্যও ক্ষমা চাচ্ছি। আমি প্রার্থনা করি আমার সন্তান অপরাধের মূল্য পরিশোধ করে আমার কাছে নবজীবনে ফিরে আসবে। আমি অবিরাম প্রার্থনা করি- একদিন আমার সন্তান রূপান্তরিত মানুষ হয়ে উঠবে। ঈশ্বরকে, নিজেকে এবং অন্যদের ভালবাসতে শিখবে। মা মারীয়ার মতো আমি নিজেই কালভেরির পথে অভিজ্ঞতা করেছি, সন্তান যখন গ্রেপ্তার হয় সেদিন আমাদের পরিবারের পুরো জীবনটা বদলে গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া ছেলের পিছনে পিছনে মা-মারীয়ার মত দীর্ঘপথ হেঁটেছিলাম। আপন বাড়িতে ছেলের সাথে আমরাও কারাগারে বন্দি আছি । মানুষের মন্তব্য একটি ধারালো ছুরির মতো হৃদয়কে বিদীর্ণ করে, হৃদয়ে সবকষ্ট সহ্য করছি কিন্তু তাকে কখনও ত্যাগ করিনি।

৭. একজন বন্দির অনুধ্যান- আমি যেদিন কারাগারে প্রবেশ করেছি আর সেদিন কারাগার আমার বাড়িতে প্রবেশ করেছে। আমি আমার শহরে সমাজের জঘন্য ব্যক্তি হয়েছি। সকলে আমাকে খুনি হিসেবে ডাকে, কি দুর্ভাগ্য আমার নামটিও হারিয়েছি। আমি কারাগারে বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি, আমি যারা কারাগারে সেবাকাজ করতে আসে সেই চ্যাপলেইনদের মধ্যস্থতায় আবার বাচঁতে শিখেছি। আমার বন্দি সঙ্গিরা আমার ক্রুশ বহন করে সাইরিনির সিমোনের মত সাহায্য করছে। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন আমি অন্যকে বিশ্বাস করতে সক্ষম হব। কাউকে না কাউকে সুখী করতে অন্যের ক্রুশ বহন করে সাইরিনির সিমোন হয়ে উঠব।  

৮. একজন বন্দির কিশোরী কন্যার অনুধ্যান- আমি একজন বন্দির মেয়ে, আমি বাবার ভালবাসার অভাব অনুভব করি। আমার মা হতাশার শিকার কারণ অনেক বছরপূর্বে বাবা কারাবন্দি, সংসার ভেঙে পড়েছে, খুব বেশি আর্থিক সংকট। আমি অল্প বেতনের কাজ শুরু করি, পরিস্থিতি আমাকে প্রাপ্তবয়স্কের অভিনয় করতে বাধ্য করেছে। বাবার পরিণতির জন্য বাড়িতে সমস্ত কিছু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে আছে। যাদের বাবা যাবজ্জীবন কারারুদ্ধ হয়েছে কেবল তারাই বুঝে। যতদূরের কারাগারেই স্থানান্তর করা হোক সেখানেই গিয়ে বাবার সাক্ষাৎ করি। যদি কারাগার কয়েকশ কিলোমিটার দূরেও হয়। আমি এখন বলি-‘এটাই জীবন।’ শুধু বাবার ভালবাসার কারণে আমি তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছি। এই আশা করাটা আমার অধিকার।

৯. অন্য একজন বন্দির অনুধ্যান- আমি কারাগার থেকেই ঠাকুরদাদা হয়েছি। আমার মেয়ের বিয়ে, গর্ভাবস্থা কিছুই দেখেনি। একদিন নাতনীকে আমার জীবনের গল্প শোনাব। আমার মন্দ কাজের গল্প নয়, হতাশার গল্প নয়, দুর্ভোগের গল্প নয়। তবে আমার বিশ্বাসের গল্প। আমি যখন বিশ্বের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ ছিলাম, একাকী মনে করেছি, ভেবেছি জীবনে অর্থ নেই, প্রায় যিশুর মত বারে বারে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলাম। নাতনীকে বলব- এমন সময় তোমার জন্ম সংবাদ আমাকে ঈশ্বরের নিকট ফিরে আসতে সাহায্য করেছে। আমি বুঝতে আরম্ভ করেছি ঈশ্বর আমাকে এখনও কত ভালবাসেন। জীবনটা কত সুন্দর, তিনি কত সুন্দর উপহার আমাকে দিয়েছে। আমি ঈশ্বরের দান নাতনীকে সত্যিই কোলে জড়িয়ে নিব একদিন, এমন আশা আমি করতেই পারি। তাকে বলব- তুমি আমার দেবদূত।

১০. আট বছর বন্দিজীবন থেকে মুক্ত একজন যাজকের অনুধ্যান- যত লজ্জাই আসুক না কেন, এক মুহূর্তের জন্য আমি সব শেষ হয়ে যেতে দেইনি। আমি স্থির করেছি আমি সর্বদা যাজক থাকব। আইনের মাধ্যমে আমি আমার ক্রুশ কমাতে পারতাম কিন্তু আমি চেয়েছি সবটুকু ক্রুশ বহন করতে। আমি নিয়মিত বিচারকের কাজে সহযোগিতা করেছি। আমি যাজক হিসেবে কয়েক বছর ধরে যাদের  সেমিনারীতে পাঠিয়েছি তারা ও পরিবার আমার পাশে থেকে ক্রুশ বহন করতে সাহায্য করেছে। তারা নিয়মিত প্রার্থনা করেছ্, আমার চোখের অনেক অশ্রু মুছে দিয়েছে। আমি যেদিন পুরোপুরি মুক্তি পাই, আমি নিজেকে দশ বছর আগের চেয়ে বেশি সুখী মানুষ মনে করেছি। মুক্ত হয়ে আমি আমার জীবনে প্রথম ঈশ্বরের কাজের অভিজ্ঞতা করেছি। ক্রুশে ঝুলন্ত অবস্থায় আমি যাজকত্বের অর্থ আবিষ্কার করেছি। প্রতিটি কারাবন্দির জীবন হউক এক একটি মঙ্গলবার্তা, খ্রিস্ট যিশু আমাদের সঙ্গেই আছেন।



(প্রকাশিত: সাপ্তাহিক প্রতিবেশী, ৭-১৩ মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ)




শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

ফেব্রুয়ারী ৮ : মানবপাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক প্রার্থনা ও সচেতনতা দিবস

 সাধ্বী যোসেফিন বাকিতা’র পর্ব: মানবপাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক প্রার্থনা ও সচেতনতা দিবস

সিস্টার যোসফিন রোজারিও, এসএসএমআই

কৃতদাসী থেকে সৌভাগ্যবতী যোসেফিন: মাতামণ্ডলী ৮ ফেব্রুয়ারী সাধ্বী যোসেফিন বাকীতার পর্ব পালন করে থাকে। তিনি ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে আফ্রিকার সুদান দেশে ওলগোসা নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকালে তিনি মা বাবা ও ভাইবোনেদের ভালবাসায় বড় হচ্ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস; মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি আরব কৃতদাস-ব্যবসায়ীদের দ্বারা অপহৃত হন এবং কৃতদাসী রূপে একাধিকবার বিভিন্ন ধনীলোকদের কাছে বিক্রি হন। কৃতদাসী রূপে তার এ বিড়ম্বনাময় জীবনে এত নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্চিত ও প্রহারিত হন যে তিনি মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে নিজের নামটা পর্যন্ত ভুলে যান ফলেন। তার একজন মালিক তাকে 'বাকিতা' (বাংলায় 'সৌভাগ্যবতী') নাম দেন। এ ছলনাময়ী নামের সাথে তার পাওয়া বিদ্রুপ, লাঞ্চনা, গঞ্জনার কোন মিল ছিল না বটে, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি উপলব্ধি করেছেন তার নামের ভবিষ্যতবাণীর সার্থকতা। যোসেফিন বাকিতা আফ্রিকার বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকায় কাজ করেছেন এবং নির্মম কষ্ট সহ্য করেছেন। একসময় এক ইতালীয়ান  রাষ্ট্র-দূত তাকে ইতালীতে নিয়ে গিয়ে তার পরিবারকে সেখানে স্থানান্তরিত করেন এবং তার পিতামাতার কাছে ফিরিয়ে দেন। এভাবে সেখানে তিনি লাভ করেন নব জীবন আর হয়ে উঠেন তার সমগ্র পরিবারের মুক্তিদাতা এবং পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটে উঠে। 

‘স্বাধীন নারী’ সিস্টার যোসেফিন বাকিতা: ইতালীর ভেনিস শহরে কেনোসিয়ান সিস্টারদের সহযোগিতায় বাকিতা কোর্ট থেকে মুক্তি লাভের সকল কার্যক্রম শেষ করে স্বাধীনভাবে ইতালীতে বাকী জীবন কাটান। ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দে তিনি বাপ্তিস্ম ও হস্তার্পণ সাক্রামেন্ত গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি কেনোসিয়ান সিস্টার হন এবং 'সিস্টার যোসেফিন বাকিতা' নামে পরিচিত হন। তিনি ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারী এ পৃথিবী থেকে চির বিদায় গ্রহণ করেন।

পাচারকৃত ভাইবোনদের প্রতিপালিকা সাধ্বী যোসেফিন বাকিতা: মানব প্রেমিক সাধু দ্বিতীয় পোপ জন পৌল যোসেফিন বাকিতাকে সাধ্বী শ্রেণীভূক্ত করেন এবং ৮ ফেব্রুয়ারী তার পর্বদিন বলে ঘোষণা করেন। ২০১৫ খ্রীষ্টাব্দে মাতামণ্ডলী তার পর্বদিনটি প্রথমবারের মত পাচারকৃত ভাই বোনদের জন্য আর্ন্তজাতিক ভাবে প্রাথর্না-অনুধ্যানের জন্য উৎসর্গ ও উদযাপন করেছেন। ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দে পোপ ফ্রান্সিস মানব পাচার নামক গর্হিত ও ঘৃন্যতম কাজটি সমাজ থেকে নির্মূল করে অধিকার বঞ্চিত, নিপীড়িত, বিড়ম্বিত ও বলিকৃত ভাইবোনদের মুক্তি ও এদের পাশে দাঁড়াবার জন্য বিশ্বের নেতানেত্রীদের দৃষ্টি আর্কষণ করেন ও একটি যথাযথ ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। সাধ্বী যোসেফিন বাকিতার কাছে পাচারে স্বীকার হওয়া ভাইবোনদের জন্য পোপ ফ্রান্সিস নিজে বিশেষ প্রার্থনা করেন ও খ্রীষ্ট মন্ডলীর সবাইকে প্রার্থনা করতে অনুরোধ করেন। এই সাধ্বী নিজ জীবনে মানব পাচার নামক নির্মম-যন্ত্রনাদায়ক জীবনাবস্থার শিকার হয়েছেন ও এর বেদনা নিজ জীবনে উপলব্ধি করেছেন কিন্তু পরবর্তীতে স্বহৃদয়বান ব্যক্তিদের আধ্যাত্মিক, মানসিক, আবেগিক ও নৈতিক সমর্থন, ভালবাসা, কাউন্সিলিং ও গ্রহণীয়তা তাকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছে; তার অভিজ্ঞতা সহভাগিতার মাধ্যমে অন্যদের দৃষ্টি উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন বলে তাকে "পাচারকৃত ভাইবোনদের প্রতিপালিকা" বলে অভিহিত করা হয়। 

মানব পাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক প্রার্থনা ও সচেতনতা দিবস: সভ্যতা বিবর্জিত জঘন্য অপকর্ম মানব পাচার। শোষণ করার উদ্দেশ্যে ভয় দেখিয়ে বা বল প্রয়োগ করে বা অন্য কোন জোড়পূর্বক উপায়ে অপহরণ, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্বল অবস্থা কাজে লাগিয়ে অর্থ আগান-প্রদান করা একটি অপরাধ। আবার যেকোন প্রকার লোভ দেখিয়ে মানুষ সংগ্রহ, পরিবহন, হস্তান্তর, লুকিয়ে রাখা নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক ব্যধি। ঈশ্বর সম-মর্যাদা দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সমগ্র সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব দিয়েছেন সেই মানুষই আজ আরেকজন মানুষকে পণ্য হিসেবে ক্রয়-বিক্রি করছে এবং যেমন তেমন ভাবে ব্যবহার-অপব্যবহার করছে। ঈশ্বর নিজে সৃষ্টি কর্তা হয়ে মানুষের স্বাধীনতাকে সম্মান করেন কিন্তু মানুষ অন্য একজন মানুষের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। তারপর জবরদস্তি করে পরিবার থেকে, সমাজ থেকে দূরে নিয়ে এমনকি দেশান্তর করে, কঠিন শ্রম দিয়ে, পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করছে। তাদের উপর যৌন নির্যাতন বা শ্লীলতাহানি, মারধর, আঘাত বা অন্য কোনো রকম শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে তার ক্ষতি সাধন করছে। কাথলিক মণ্ডলীতে পোপ ফ্রান্সিস এ গর্হিত কাজের তীব্র নিন্দা জানিয়ে পাচারকারী ভাইবোনের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মুক্তির জন্য প্রত্যেক মানুষকে জেগে উঠতে উৎসাহিত করছেন। তাই তিনি ৮ ফেব্রুয়ারী সাধ্বী যোসেফিন বাকিতার পর্ব দিনে বিশ্ববাসীদের মানব পাচার বিরুদ্ধ দিবস হিসাবে উদ্যাপন করতে আহ্বান জানান। 

তালিথা কুম নেটওয়ার্ক: ২০০৯ খ্রীষ্টাব্দে পোপ ফ্রান্সিস মহোদয়ের অনুরোধে বিশ্বব্যাপী সিস্টার সন্ন্যাস সংঘের মেজর সুপিরিয়রদের সম্মেলিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভাটিকান কেন্দ্রিক “তালিথা কুম আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক” (Talitha Kum International Network)। এ নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ত হয়ে সিস্টারগণ বিশ্বের বুক থেকে মানব পাচার, জোড়পূর্বক অভিবাসন, অনৈতিক ও অন্যায্য মালিক-শ্রমিক সম্পর্কযুক্ত অমানবিক কর্ম পৃথিবী থেকে নির্মূল করার জন্য সেবাকাজ করে যাচ্ছেন।  পবিত্র বাইবেলের আরাময়িক শব্দ "তালিথা কুম" (বাংলায় 'খুকু আমি তোমাকে বলছি, তুমি উঠ') গ্রহণ করা হয়েছে (মথি ৫:৪১)। International Union of Superior General (UISG) সম্মিলিত ভাবে মানব পাচার নিরোধের প্রত্যাশায় ২০০৯ খ্রীষ্টাব্দে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে  সেবাকাজ আরম্ভ করেন। ২০০৭ খ্রীষ্টাব্দে যখন কাথলিক সন্ন্যাসব্রতিনীগণ অনুভব করলেন  নারী পাচারের সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকমে বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন থেকে সেবাকাজের অনুপ্রেরণা আরম্ভ হয় । ২০১৩ খ্রীষ্টাব্দে মোট ৭৫টি দেশের বেশ কয়েকজন নারী সন্ন্যাসব্রতী সংঘ-প্রধানগণ সম্মেলিতভাবে সিস্টার ইষ্ট্রেল্লা কাস্টালনে এর নেতৃত্বে প্রায় ৬০০ সিস্টার একত্রে গুরুত্ব সহকারে কাজ করতে শুরু করেন এবং ২০১৫ খ্রীষ্টাব্দে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৮০টি দেশের ১১০০ জন সেবাকর্মী সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এশিয়া মহাদেশের ৮টি দেশ এ কার্যক্রম খুবই আন্তরিকতা সাথে কাজ করছেন্। বাংলাদেশে ন্যায় ও শান্তি কমিশন-সিবিসিবি ও বিসিআর এর যৌথ সমর্থনে এবার বাংলাদেশ মণ্ডলীও  প্রত্যক্ষভাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে।

তালিথা কুমের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য: (১) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্রতধারী/ধারিনী, সামাজিক সংঘটন, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতা নেত্রীদের মধ্যে মানব পাচার বিরুদ্ধ নেটওয়ার্ক তৈরী করা; (২) চলমান কার্যক্রম ও পদক্ষেপগুলো কে আরো শক্তিশালী করা, সন্ন্যাসব্রতী সংঘগুলির মানব সম্পদের অনুকূলকরণ ও তাদের সম্ভাবনাগুলির সুষ্ঠ প্রয়োগ, প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ, সচেতনতা প্রদান, ভূক্তভোগীদের পূর্ণবাসন ও সংরক্ষণ, এবং পাচার বিরুদ্ধ অফিসিয়াল রির্পোট প্রদান; (৩) চলমান ঘটনা বিষয়ে সদস্যাদের জন্য সচেতনতামূলক শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম প্রনয়ন ও উন্নয়ন এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়ন; (৪) সদস্যাদের প্রাবক্তিক ভূমিকা বিষয়ে সোচ্চার করে তোলা, শোষনকারী-দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ভাবে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, আইনী সহায়তা দাবী পূরণে সহায়তা এবং নারীদের ক্ষমতায়নে আইনী সহায়তা প্রদান ও পাশে দাঁড়ানো।

বাংলাদেশে মানব পাচারের ভয়াবহ রূপ: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রেস রিপোর্ট অনযায়ী- মানব পাচারে জড়িতচক্রসমূহ লোভনীয় চাকরি ও সুযোগ-সুবিধার নামে ‘মিথ্যাস্বপ্ন’ দেখিয়ে বাংরাদেশের লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ ও শিশুদের এ পথে নিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক পাচার, যৌন-দাসত্ব, সংখ্যালঘু ও দুর্বল মানুষদের বেআইনী ভাবে ব্যবহার ও নির্যাতন, মানবাধিকার খর্ব, প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে এক কুচক্রীমহল কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এদের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েই চলছে এদের দমনের উদ্যোগ না নিলে দেশ ও সমাজ এক কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হবে। র‌্যাবের রিপোর্ট অনুসারে শুধু মাত্র ডান্স ক্লাবের নামে গত দেড় বছরে সহস্রাধিক  নারী পাচার হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে- বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ অবৈধভাবে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে; এদের একটি বড় অংশ পাচার হয়ে যায়। এসবের মূলে দারিদ্রতা, মিথ্যাস্বপ্ন, কর্ম সুযোগের অভাব, স্বল্প শিক্ষা, পরিবারগুলির ভাঙ্গন প্রক্রিয়া, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা, অভিবাসন নীতিমালা ইত্যাদি বিষয়কে দায়ী করা যায়। তাই বাংলাদেশ মণ্ডলী মানব পাচার মুক্ত অর্থনীতি গঠনে পোপ মহোদয়ের সাথে "তালিথা কুম নেটওয়ার্ক" এর মূলনীতি অনুসরণ করে সরকার ও মানব পাচারে শিকার ভাইবোনদের পাশে দাঁড়াতে ও তাদের সেবা করতে জোড়ালো ভূমিকা রাখতে ইচ্ছা প্রকাশ করছে। 


(তথ্যসূত্র: তালিতা কুম ডেস্ক ইনফরমেশন ও ইন্টারনেট) 




আধ্যাত্মিক একাত্মতা ও রূপান্তরমূলক পরিবর্তন

১. কারাগারে বন্দিদের সাথে সাক্ষাতের সময় একজন বন্দি পবিত্র সাক্রামেন্ত গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করে। ইতোমধ্যে তার বন্দিজীবনে নয়টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু মামলার বিচারকাজ এখনও চলমান আছে। দীর্ঘসময় সে পবিত্র সাক্রামেন্ত গ্রহণ করতে পারেনি। দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎকালেও কারাকর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া যায়নি। অনেক আলোচনা করে বড়দিনের সাক্ষাতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া গেল। তবে সীমিত সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে । এদিকে বড়দিনের কেক কাটবেন কারাকর্তৃপক্ষ, এরপর অন্যান্য বন্দিদের মাঝে বড়দিনের উপহার বিতরণ করা হবে। ইতোমধ্যে খ্রিস্টভক্তসহ কারাবন্দিদের একটি দল দরবার কক্ষে উপস্থিত হয়েছে। প্রথমে খ্রিস্টান বন্দিরা পাপস্বীকার সাক্রামেন্ত গ্রহণ করল তারপর অল্প সময়ে খ্রিস্টযাগ সমাপ্ত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর পাপস্বীকার সাক্রামেন্ত গ্রহণের সময় সকলের চোখেজল দেখেছি, অন্যদিকে খ্রিস্টকে গ্রহণ করে সকলের চেহারায় আনন্দের প্রকাশ ছিল। বিদায়ের সময় খ্রিস্টভক্ত বন্দির অনুভূতি অনেকটা এমন ছিল- ‍‍‌"মূল্যবান কিছু পেতে পেতে হঠাৎ যখন বঞ্চিত হই তখনই গুরুত্ব বুঝতে পারি।" বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের সাক্ষাৎকালে প্রায় সময় একই উপলব্ধি সহভাগিতা করেছে। কারাবন্দিরা নিয়মিত আধ্যাত্মিক অনুশীলন থেকে বঞ্চিত থাকে। তারা জানে না আবার কখন খ্রিস্টকে গ্রহণ করতে পারবে। তবে আধ্যাত্মিক একত্মতায় তারা খ্রিস্টের সাথে যুক্তই আছে। কভিড-১৯ সংক্রমণ যেন দ্রæত বিস্তারিত না হয় সেজন্য আমরা নিজ বাড়িতে অন্তরীণ ছিলাম। যা আমরা অবজ্ঞা করে চলতে পারছি না। এ সময়টা কিছুটা কারাবন্দির মতোই আছি। এ সময় নিয়মিত খ্রিস্টযাগে যোগদান করে আধ্যাত্মিক অনুশীলন আমরা করতে পারছি না, কিন্তু আমরা খ্রিস্ট ও খ্রিস্টভক্তদের সঙ্গে আধ্যাত্মিকভাবে একাত্মই থাকতে পারি।  

২. খ্রিস্টীয় ইতিহাসের প্রথম পর্যায়ে অনেক সাধুজন আধ্যাত্মিক সাধনায় সন্ন্যাস জীবনযাপন করতেন। তারা স্বেচ্ছায় মরুপ্রান্তরে ছোট ছোট ঝুপড়িতে একা একা ধ্যানমগ্ন থাকতেন। পাশাপাশি ৫/৬জন সন্ন্যাসী অবস্থান করলেও পরস্পরের সাথে অতি প্রয়োজন ছাড়া দেখা-সাক্ষাৎ ছিল না। একজন পথিক যাত্রাপথে পাশের সন্ন্যাসীর ঝুপড়ির সামনে ঝুড়িতে কিছু আঙ্গুর ফল রেখে গেল, এমনটি প্রচলিত ছিল। সন্ন্যাসী তার ঝুপড়ির সামনে সুস্বাদু আঙ্গুরের ঝুলি পেয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। তিনি চিন্তা করলেন- রাস্তা থেকে আমার ঝুপড়িই প্রথম। পথিকরা আমার কাছে যখন-তখন আবারও কিছু নিশ্চয়ই রাখবে। আমি বরং পাশের সন্ন্যাসীকে আঙ্গুরগুলো দিয়ে আসি। পাশেরজন তার ঝুপড়ির সামনে লোভনীয় আঙ্গুর দেখে খুব খুশি হলেন। তিনি চিন্তা করলেন- বেশ ভালই হলো পাশের সন্ন্যাসী দেখছি কয়েকদিন যাবৎ অসুস্থ, আঙ্গুরগুলো এসময় তার সুস্থস্তার জন্য উপকারী হবে। এবার অসুস্থজন আঙ্গুরের ঝুড়ি পেয়ে ভাবলেন- আমার পাশে যুবক সবেমাত্র সন্ন্যাস জীবনে যোগ দিয়েছে তার নিশ্চয়ই ভালকিছু খেতে ইচ্ছে করছে। তিনি আঙ্গুরের ঝুড়ি যুবকের ঝুপড়ির সামনে রেখে গেলেন। এদিকে যুবক সন্ন্যাসী চিন্তা করল- আমার সামনে অনেক সময় আছে; আমি বরং পাশের প্রবীন সন্ন্যাসীকে আঙ্গুরগুলো দিয়ে আসি। এবার প্রথম সন্ন্যাসী দেখলেন- ঝুড়ি ভর্তি লোভনীয় আঙ্গুর ফল তার ঝুপড়ির সামনেই আছে। সন্ন্যাসীরা ধ্যান-সাধনার উদ্দেশ্যে সামাজিক দূরত্ব, সঙ্গনিরোধ, বিচ্ছিন্ন থাকা এবং বন্ধাবস্থা স্বেচ্ছায়  গ্রহণ করেছেন। তথাপি তারা আধ্যাত্মিক একাত্মতায় পরস্পরের কাছে আছেন। বিভিন্ন কারণে মানুষ বিচ্ছিন্ন বা দূরত্বে থাকতে পারে। তবে পরস্পরের প্রতি যখন ভালবাসা থাকে, অন্যের উপকার করার মনোভাব থাকে এবং অন্যর জন্য মঙ্গলকাজ করে তখন আধ্যাত্মিক একাত্মতায় থাকতে পারি। 

৩. করোনাভাইরাসটি নির্মুল করার যুদ্ধসময়ে বিশ্বাসের ঐতিহ্যগত ‘আধ্যাত্মিক একাত্মতা’ অনুশীলন নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমানের আহ্বান। তৃতীয় শতাব্দীর প্লেগ মহামারীর সময়টা সাধু সিপ্রিয়ান মানুষের অন্তরে বিশ্বাস ও আশা জোরদারের সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি প্রচুর সাহস এবং বিপুল আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন- 'এটা কতই না আধ্যাত্মিক মহিমা' যা 'ধ্বংস ও মৃত্যুর আক্রমণ' এর সামনে জীবন্ত বিশ্বাস নিয়ে অবিচল থাকা। ভয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হওয়ার পরিবর্তে বিশ্বাসে শক্তিশালী হতে 'সুযোগটি আলিঙ্গন করা' দরকার। আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসেবে পবিত্র খ্রিস্টযাগে অংশগ্রহণ ও খ্রিস্টের উপস্থিতি অভিজ্ঞতা করার বিকল্প কিছুই নাই। কিন্তু মহামারী সময়ে 'আধ্যাত্মিক একাত্মতা' প্রথমে অর্থহীন বিকল্প হিসেবে মনে হতে পারে কিন্তু নিজেরা অভিজ্ঞতা করতে পারব যে এটি সত্যিই ঈশ্বরের একটি অসাধারণ অনুগ্রহ। অনেক শতাব্দী পর্যন্ত সাধু ও ধর্মতত্ত্ব বিদরা নিজেরা অভিজ্ঞতা করেছেন ও বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন। আভিলার সাধ্বী তেরেজা অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন- যখন তুমি পবিত্র খ্রিস্টযাগে অংশগ্রহণ করতে পার না, খ্রিস্টকে গ্রহণ করার সুযোগ পাও না, তখন খ্রিস্টের সাথে 'আধ্যাত্মিক একাত্মতা' অভ্যাস করবে। তখন দেখবে খ্রিস্টের ভালবাসায় দিনে দিনে তুমি আপ্লুত হতে থাকবে। একা কারাবন্দি অবস্থায় ক্রুশভক্ত সাধু যোহন একটি কবিতায় লিখেছেন- জীবন্ত জলের ঝর্ণা বিশ্বাসীর অন্তরে সর্বদা সঞ্চারিত হয়, এমনকি বিশ্বাসের অন্ধকার সময়েও। বুলগেরিয়ার একজন বিশপ বহু বছর আগে বলেছেন- তার দেশে কমিউনিস্ট নির্যাতনের সময়কালে অনেক পুরোহিত রাজপথে প্রাণ দিয়েছে অথবা কারাগারে বন্দি ছিল। এমন অবস্থায় পুরোহিত ছিল না। বিশ্বাসী খ্রিস্টভক্তগণ যখন পাপস্বীকার করতে ইচ্ছা করত তখন তাদের পরিচিত পুরোহিতের কবরে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে পাপস্বীকার করত। পবিত্র ক্রুশ সংঘের অর্থাৎ আমার সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ফা. বাসিল আন্তনী মরো'ও স্বেচ্ছায়  'একা অন্তরীণ' ধ্যান প্রার্থনা কাটাতেন। তিনি মাঝে মাঝে ফ্রান্সের এক নিভৃত ছোট পল্লীর এই বাড়িতে প্রার্থনারত একা থাকতেন কিছু দিন। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই সেখানে আমি গিয়েছি এবং একটি ক্ষুদ্র দলের সাথে প্রার্থনা করেছি।

৪. মরুভুমিতে খ্রিস্ট যিশুর একাকী অভিজ্ঞতা ও তাঁর ধর্মনিষ্ঠার পরীক্ষা (মথি ৪:১-১১) ঘটনা আমার জানি। মরুপ্রান্তরে দীক্ষাগুরু যোহনের বাণী প্রচারের গল্পটি আমাদের স্মরণ আছে (৩:১-১০)।  ইহুদী ধর্মনেতাদের ভয়ে শিষ্যরা ‘দরজা বন্ধ করে’ একত্রে ছিল এবং তারা যিশুর দেখা পেয়েছে  (যোহন ২০:১০)। তারা অন্যান্য লোকদের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। বাইবেল আমরা পড়ি আরও একবার শিষ্যরা কীভাবে 'একত্রে অন্তরীণ' অবস্থায় সেই 'উপরের ঘরে' ছিলেন । লক্ষণীয় বিষয় এবার তারা ভয়ে তাদের হৃদয় হিমশীতল হতে দেয়নি বরং পবিত্র আত্মার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছিল (শিষ্যচরিত ১:১২-১৪, ২: ১-১২)। পবিত্র বাইবেলে অন্ধ বার্তিমেয় (মার্ক ১১০:৪৬), অসুস্থ মহিলা, অনিহুদী স্ত্রীলোক (মার্ক ৭:২৪-৩০) এমন অনেকে সামাজিক কারণে যিশুর কাছে যেতে পারেনি। কিন্তু তারা যিশুর নিরাময় কৃপা লাভ করেছেন কারণ তাঁর সাক্ষাৎ লাভের তাদের অন্তরে গভীর ইচ্ছা ছিল। যিশুর সাথে তারা আধ্যাত্মিক একাত্মতায় ছিল। অন্যদিকে করগ্রাহক ও পাপীরা (লুক ১৫:১-১০) গভীর আগ্রহ নিয়ে যিশুকে গ্রহণ করতে অপেক্ষা করেছে, যখন সুযোগ পেয়েছে তখন যিশুর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়নি। হারানো ছেলে 'বিচ্ছিন্ন  জীবনযাপন' করে বাবার ভালবাসা আবিস্কার করেছে এবং অন্তরে আধ্যাত্মিক একাত্মতা জাগ্রত হয়েছে; অন্যদিকে বড়ছেলে বাবার সাথে একই বাড়িতে থেকেও অন্তরে বাবার ভালবাসায় একাত্ম হতে পারেনি (লুক:১৫:১১-৩২)। 

৫. করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মানুষের জীবন সামাজিক দূরত্ব, সঙ্গনিরোধ, বিচ্ছিন্ন থাকা এবং বন্ধাবস্থা এই চারটি পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আমরা সকলে তা অভিজ্ঞতা করেছি। এমন অবস্থায় খুব সহজেই আমাদের ভিতরে ভয়, ক্রোধ, তিক্ততা, অভিযোগ এবং হতাশার মনোভাব প্রবলভাবে প্রতিপালন করতে পারে। শিষ্যদের অন্তরীণ থাকার কী বিশেষত্ব ছিল যা তাদের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি রূপান্তরিত করেছিল। আমরা পড়ের্ছি 'কয়েকজন স্ত্রীলোক এবং যিশুর মা মারীয়ার সাথে শিষ্যরা একত্রে প্রার্থনারত ছিলেন' (শিষ্যচরিত ১:১২-১৪)। প্রার্থনা আমাদের জন্য বিরাট আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য যা বিভিন্ন সময় দেখি ও অভিজ্ঞতা করছি। একটি অন্ধকার ও বিরক্তকর অভিজ্ঞতা যা আমাদের কাছে অভিশাপের মত হতে পার। ঐ মুহূর্তে প্রার্থনা আমাদের জীবনে গভীর অভ্যন্তরীণ রূপান্তর আনে, শান্তির সূচনা করে। এমন কী কিছু সময় পরে অপ্রত্যাশিত আনন্দ ও আর্শীবাদের অভিজ্ঞতা করতে পারি। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও মহা ব্যস্ততা থেকে বাধ্য হয়ে দূরে আছি যেখানে আমরা 'বিশ্বটা অবরুদ্ধ' বা 'পৃথিবীটা মনেস্টারি' ভাবছি। করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে অবরুদ্ধ সময় বাধ্য হয়ে মানবিক কর্মব্যস্ততা থেকে বিরতি নিয়ে ধ্যানময় বিশ্রামে সময় কাটাতে সুযোগ পেয়েছি। এমনও হতে পারে অবশেষে সৃষ্টিকর্তা বিশ্বের এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হুমকি স্বরূপ ঘাতক ভাইরাসটি দুনিয়া থেকে নির্মুল করবেন। আমাদের বিশ্ব, আমাদের সমাজ, আমাদের মণ্ডলী হয়ে উঠবে পুনর্নবীকরণ, ব্যাপক রূপান্তরিত যা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।  

৬. এই অবরুদ্ধ সময় আমাদের ভাবতে সুযোগ দিয়েছে- শুধু পেশাগত কাজে ডুবে কাজপাগল (ওয়ার্কএহলিক) হয়ে থাকতে আমাদের সৃষ্টি করা হয়নি অথচ আমরা কেউ কেউ তা-ই করে থাকতে পছন্দ করি। পোপ ফ্রান্সিস আমাদেরকে এ বছরের প্রথম দিন 'যত্নের সংস্কৃতি' গড়ে তুলতে পরামর্শ দিয়েছেন, ধরিত্রির সুরক্ষা করা ঈশ্বরের নিকট থেকে প্রাপ্ত দায়িত্ব। পিতা ঈশ্বর বিশ্বসৃষ্টি কাজে বিশ্রাম নিয়েছেন, বিস্ময়বোধ প্রকাশ করেছে 'সত্যিই তা খুব ভালই হয়েছে।'  ধর্মীয় শিক্ষায় প্রতি সপ্তাহে একদিন বিশ্রাম দিবস উদ্যাপনের নির্দেশনা আমরা পেয়েছি। তাতে আমাদের ক্ষতবিক্ষত অন্তরের পরিবেশ, মানব পরিবেশ ও প্রকৃতি পরিবেশ নিরাময় হতে পারে। এমন বিশ্রাম উদ্যাপন অনূৎপাদনশীল ও নিষ্প্রয়োজন নিষ্ক্রিয়তা বা কর্মহীনতার চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বতন্ত্র মনে করতে হবে। যা অন্য রকম ভাবে আমাদের অন্তরে কাজ করে, যা হচ্ছে আমদের সত্তারই নবায়ন (লা.সি. ২৩৭)। 

৭. ঘরবন্দি অবস্থায় আমরাও প্রেরিতশিষ্যদের ও মা মারীয়ার মত নিয়মিত প্রার্থনা ও পবিত্র বাইবেল পাঠ করতে পারি। এমন আধ্যাত্মিক একাত্মতা অনুশীলন করে নিজে রূপান্তরিত হতে পারি ও  অন্যকে রূপান্তরিত হতে অনুপ্রাণিত করতে পারি। আমাদের অভিজ্ঞতা আমাদের বিশ্বাসের সাক্ষ্যদান হবে তখনই যখন- প্রার্থনা, ধ্যান, উপাসনা, ধর্মশিক্ষা ও সংস্কারীয় জীবনের প্রতি আমাদের অনুরাগ ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। খ্রিস্টীয় বিবাহ, যাজকীয় ও সন্ন্যাসব্রতী জীবনের আহবান সম্পর্কে নবচেতনা ও নবজাগরণ ঘটবে। স্থানীয়, ধর্মপ্রদেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মণ্ডলীর কর্মসূচী ও কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহ বাড়বে। সামাজিক জীবনের সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ বাড়বে। দয়াকর্ম, সাংস্কৃতিক, সৃষ্টির যত্ন ও আধ্যত্মিক কর্মকান্ডের জন্য নতুন উদ্যোগ ও চেতনা সৃষ্টি হবে। খ্রিস্টবিশ্বাসে যাদের স্খলন ঘটেছে, তারা আবার খ্রিস্টীয় জীবনে ও মণ্ডলীর মিলন-সংযোগে ফিরে আসে। আসুন, আমরা আধ্যাত্মিক একাত্মতার অনুপ্রেরণায় থাকি এবং ঈশ্বরের সাথে, নিজের সাথে, অপরের সাথে ও বিশ্বসৃষ্টির সাথে আমাদের সম্পর্ক নিরামায় ও রূপান্তর হতে দিই।




বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২০

খুঁজতে খুঁজতে ওদের পথেই পাওয়া গেল


(সংগৃহীত) ঢাকায় এমন হাজারো শিশুর ঠাঁই রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, স্টেডিয়ামগুলোর আশপাশে। আর্থ-সামাজিক নানা টানাপড়েনে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই শিশুদেরপরিচয় ‘পথশিশু’। 

২০০৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএসের এক জরিপ বলছে, সারা বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১৩ লাখ।

বাংলাদেশে পথ শিশুর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতদ্বৈততা রয়েছে। ২০০৪ সালে বিআইডিএসের জরিপের বিষয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পথশিশু বিষয়ক সেলের প্রধান আবুল হোসেন বলেন, “এই স্টাডি অনেক পুরাতন হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে এবং নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাই পথশিশুদের প্রকৃত সংখ্যা বর্তমানে কত, এটা না জানলে তাদের জন্য বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করা ‍দুরূহ হবে।”

২০০৫ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের শতকরা ৪১ ভাগ পথশিশুর ঘুমানোর বিছানা নেই; ৪০ শতাংশ প্রতিদিন গোসল করতে পারে না; ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে, ৮৪ শতাংশ শিশুর শীতবস্ত্র নেই; ৫৪ শতাংশ শিশুর অসুস্থতায় দেখার কেউ নেই; ৭৫ শতাংশ পথশিশু অসুস্থতায় ডাক্তার দেখাতে পারে না।

শিশুদের মাদকাসক্তির চিত্রও ভয়াবহ। শিশু অধিকার ফোরামের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৮৫ ভাগ পথশিশু মাদকাসক্ত।

তাদের ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ শিশু ধূমপান, ২৮ শতাংশ নানা ট্যাবলেট, ৮ শতাংশ শিশু ইনজেকশনে আসক্ত।

৮০ শতাংশ শিশু কাজ করে জীবন টিকিয়ে রাখতে; ২০ শতাংশ শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়, ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু সার্বিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। 

বাংলাদেশ পথশিশুদের নিয়ে কর্মরত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক-স্ক্যান মহামারীর মধ্যে গত মার্চে রাজধানীর মহাখালী, এয়ারপোর্ট, কমলাপুর, গাবতলী, সদরঘাটসহ আটটি এলাকায় পথশিশুদের জীবনমান নিয়ে একটি জরিপ চালায়। গত ২৬-৩১ মার্চ পর্যন্ত এ জরিপ চলে।

জরিপে পাওয়া তথ্যের প্রসঙ্গে স্ক্যানের সভাপতি জাহাঙ্গীর নাকির বলেন, “জরিপে আমরা পথশিশুদের স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে ভয়াল এক অবস্থা দেখতে পাই। ওরা কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস কী সেটা জানেই না।

“সবাই একসাথেই থাকে, স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই। ওরা সারাদিন ঘুরে বেড়ায় এখানে সেখানে। ওরা তো করোনাভাইরাসের ক্যারিয়ার হতে পারে।”

স্ক্যানের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মহামারীতে কর্মসংস্থান হারনো পথশিশুরা অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।বাংলাদেশ জুড়ে পথশিশুদের জীবনমানের যখন এ হাল, তখন নড়েচড়ে বসেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রমের উদ্যোগে একটি অনলাইন সভায় আসে নানা সুপারিশ।

সে সভায় এক শিশু অধিকারকর্মী জানান, ঢাকা শহরের পথশিশুদের বর্তমান বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে একটি সমীক্ষা পরিচালনায় গুরুত্বারোপ করা হয়।

অনলাইন সভার সুপারিশগুলো হল-

>> করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় শিশুদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

>> গত ২৬ মার্চ লকডাউন শুরুর পর অদ্যাবধি যেসব সেন্টার বা আবাসনে অবস্থানকারী শিশুদের অতিরিক্ত নতুন শিশুর না নেওয়ায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

>> বেসরকারি উদ্যোগে তাৎক্ষণিকভাবে পথশিশুদের সামরিক অবস্থান ও খাদ্য সরবরাহের যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে তা ক্রমান্বয়ে নিয়মিত প্রোগ্রামের রূপান্তরের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

>> সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পথশিশুদের সহায়তায় যেসব উত্তম চর্চা তাদের সুরক্ষা ও উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তা অন্যদের সাথে বিনিময় করতে হবে।

>> ঢাকা শহরের পথশিশুদের বর্তমান বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে।

>> কোভিড-১৯, নদী ভাঙ্গন অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ভালনারেবিলিটি শনাক্তকরণের লক্ষ্যে একটি ব্যাপক জরিপ সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে।

>> সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এবং চলমান কর্মসূচির আলোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গঠন করা জরুরি।

>> পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত এবং অসহায় শিশুদের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করার জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

>> পথশিশু সুবিধাবঞ্চিত এবং অসহায় শিশু যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ, শারীরিক, যৌন, মাদক, হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে সকলে সতর্ক দৃষ্টি রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

>> পথে অবস্থানকারী শিশুরা যাতে তাদের পিতামাতা অভিভাবক বা পরিবারের ফিরে যেতে পারে সে ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রমের পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, “আমরা আগে জরিপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। জরিপ করলে জানা যাবে শিশুরা কেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, শিশুরা যখন পরিবার থেকে চলে আসে তখন তারা কিন্তু ভালনারেবল। তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, কেউ শারীরিক বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।

“আমরা ইতোমধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সেটি চূড়ান্ত হলে আমরা পথশিশুদের নিয়ে জোরসোরে কাজ শুরু করব।”


তথ্যসূত্র: জয়ন্ত সাহা (নিজস্ব প্রতিবেদক), ৩ নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম




করোনাভাইরাস মহামারী সময়েও দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

 দেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।

লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ মাইনোরিটি ওয়াচ ও গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর সাত মাসের ‘সাম্প্রদায়িক চালচিত্র’ তুলে ধরা হয়।

এতে বলা হয়, এই সময়ে দেশে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ১৭ জন হত্যা, ১০ জন হত্যাচেষ্টার, ১১ জনকে হত্যার হুমকির, ৩০ জন ধর্ষণ-গণধর্ষণ ও নির্যাতন, ছয় জন ধর্ষণচেষ্টা, তিনজন শ্লীলতাহানির কারণে আত্মহত্যা, ২৩ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন।

পাশাপাশি ২৭টি প্রতিমা ভাঙচুর, ২৩টি মন্দিরে হামলা-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ, ২৬টি বসতবাড়ি, জমি ও শ্মশান উচ্ছেদের ঘটনা, পাঁচটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দখলের ঘটনা, ৭৩টি উচ্ছেদ চেষ্টা, ৩৪ জনকে দেশত্যাগের হুমকি, ৬০টি পরিবারকে গ্রামছাড়া করা, চারজনকে ধর্মান্তরিত হতে হুমকি, সাতজনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণ, ৮৮টি বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাট, ২৪৭ জনকে দৈহিক হামলা, ২০টি পরিবারকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ বিতরণকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানানো এবং মহানবীকে কটূক্তির মিথ্যা অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়েছে।

রাণা দাশগুপ্ত বলেন, এসব সন্ত্রাসের কোনো-কোনোটির সাথে সন্ত্রাসীরা সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীর পরিচয় দিয়েছে। এই চালচিত্র সম্পূর্ণ চিত্র নয়, সমগ্র ঘটনার আংশিক মাত্র। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাংলাদেশে নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মূল লক্ষ্য ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভীত করে দেশত্যাগে বাধ্য করা যাতে দেশটি সংখ্যালঘু শূন্য হয়ে পড়ে।

ধর্ম অবমাননার জিগির তুলে দিনাজপুর, পার্বতীপুর ও কুমিল্লার মুরাদনগরে সংখ্যালঘু এলাকায় আক্রমণ-অগ্নিসংযোগ নারী নির্যাতন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব বাতিলের অপপ্রয়াসের প্রতিবাদে ও গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে, অধ্যাপক কুশল চক্রবর্তীকে হত্যার হুমকি, ধর্মপ্রাণ শহিদুন্নবী জুয়েলকে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে এবং সংখ্যালঘুর সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন এই আট দাবি পরিষদের।

সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের নেতা চন্দন বিশ্বাস, বরুণ কান্তি চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, দোলন মজুমদার, সুভাষ দাশ, অসীম দেব, হরিপদ চক্রবর্তী, অশোক চক্রবর্তী, স্বরুপ পাল ও রুবেল পাল উপস্থিত ছিলেন।



তথ্যসূত্র: চট্টগ্রাম ব্যুরো, ৩ নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম