সৃষ্টি ও প্রকৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সৃষ্টি ও প্রকৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৪ মে, ২০২২

লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম বাংলাদেশ - দিকনির্দেশনা

 ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে ‌"লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম" এ সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য ‘বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী’র দিকনির্দেশনা

জগতের আর্তনাদ, দরিদ্রদের আর্তনাদ

'লাউদাতো সি'-"হে আমার প্রভু, তোমার প্রশংসা হোক"। ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন’'নামক পুণ্য দপ্তর এর সাথে একাত্ম হয়ে 'বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী' আগামী সাত বছর "লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম" (২০২১ থেকে ২০২৭ খ্রিস্টাব্দ) শিরোনামে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা বিষয়ক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়েছে। 'লাউদাতো সি' সর্বজনীন পত্রটির সাতটি লক্ষ্যসমূহ হল- (ক) জগতের আর্তনাদে সাড়াদান, (খ) দীনদরিদ্রদের আর্তনাদে সাড়াদান, (গ) পরিবেশগত অর্থনীতি বিস্তার, (ঘ) টেকসই সহজ-সরল জীবনধারা গ্রহণ, (ঙ) পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ক শিক্ষা, (চ) পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্দীপ্ত আধ্যাত্মিকতা অনুশীলন এবং (ছ) সমাজকে সম্পৃক্তকরণ ও অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ। সস্প্রতি পোপ ফান্সিস বলেছেন- 'লাউদাতো সি' শুধু সবুজ সর্বজনীন পত্র নয়, বরং এটি একটি সামাজিক সর্বজনীন পত্রও। 

১. ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন' নামক পুণ্য দপ্তর লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য গোটা  মণ্ডলীকে সাতটি কর্মক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে- (ক) পরিবার, (খ) ধর্মপল্লী, (গ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, (ঘ) সংগঠন ও ক্লাব, (ঙ) সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, (চ) হাসপাতাল এবং (ছ) ধর্মসংঘসমূহ ইত্যাদি। এই নির্দেশনা দেশের প্রথম অধিবাসি জীবনধারা অনুধাবন করতে; জগতের আর্তনাদ ও দরিদ্রের আর্তনাদে ঐশতাত্ত্বিক ভিত্তি  অনুধাবন করতে; এবং 'লাউদাতো সি'র লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মৌলিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করছে। সুতরাং বিগত দিন গুলোতে আমরা উন্নয়ন কর্মকাÐসহ আমাদের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সমন্বিত পরিবেশের যে ক্ষতিসাধন করেছি, তা পুনরুদ্ধারের জন্য আগামী সাত বছর "লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম" এ অবিরত সৃজনশীল উদ্যোগ, কর্মপরিকল্পনা এবং কর্মকৌশল গ্রহণ করবো। 

২. ভাটিকানের পুণ্য দপ্তর ২২-২৯ মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ "লাউদাতো সি সপ্তাহ-২০২২" ঘোষণা করেছে এবং মূলসুর হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে "শোনা এবং একসাথে পথচলা" যা পোপ মহোদয়ের আহ্বানে "আমাদের অভিন্ন বসতবাটিকে রক্ষা করতে গোটা মানব পরিবারেেক একত্রিত করবে" (লাউদাতো সি, অনুচ্ছেদ-১৩)। এ উদ্যাপনের মূল উদ্দেশ হলো- সর্বজনীন পত্রটির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনা বৃদ্ধি, আমাদের অভিন্ন বসতবাটির যতেœর মৌলিক নীতিসমূহ প্রচার এবং পরিবেশগত রূপান্তরের দিকে একসাথে যাত্রা করা। এ সপ্তাহটি উদ্যাপন বিশ্বকে দেখাবে কাথলিক মণ্ডলীর ২২০,০০০টি ধর্মপল্লীর ১.৩ বিলিয়ন খ্রিস্টভক্তজনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে সাত বছরে কতটা পরিবর্তিত হয়েছে এবং সারা বিশ্বের জনগণকে অনুপ্রাণিত করছে। তাই বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী (সিবিসিবি) আগামী সাত বছর "লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম" কার্যক্রমে সকল অংশীজনদেরকে- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ক্লাব, যুবসংঘ, পালকীয় সেবাকেন্দ্র, সেমিনারি, ছাত্রাবাস, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, হাসপাতাল, এবং সকল ধর্মসংঘ সবাইকে সাথে নিয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে আহ্বান জানাচ্ছে।

৩. সিবিসিবি কমিশনসমূহের সচিব ও সদস্যদের নিয়ে একটি কার্যনির্বাহী "লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম দল" গঠন করা হয়েছে। যারা আগামী সাত বছরের কার্যক্রম নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করবে এবং সকল অংশীজনদের দিক্নির্দেশনা দিয়ে যাবে। এই দলে শিক্ষক, যাজক, ব্রাদার, সিস্টার, যুবক-যুবতী ও আগ্রহী ব্যক্তিদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ডাইয়োসিস পর্যায়েও অনুরূপ একটি সক্রিয় দল গঠন খুবই বাস্তব সম্মত হিসেবে ধারণা করা হয়েছে। কর্মপরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে (ক) আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধিমূলক (Spiritual Events), (খ) জীবনধারা পরিবর্তনমূলক (Action Events) ও (গ) গণমঙ্গল নীতিমালামূলক (Policy Events) ।

৪. সর্বপর্যায়ে ব্যাপকতর সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মে ১৫, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ রবিবার বাংলাদেশ কাথলিক মÐলীর সকল গীর্জায় একযুগে রবিবাসরীয় খ্রিস্টযাগের মাধ্যমে “লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম’ উদ্যাপন উদ্ভোধন করা হবে। এ উপলক্ষে খ্রিস্টযাগ কাঠামো ও উপদেশ সহায়ক তৈরি করে প্রত্যেক ডাইয়োসিসে প্রেরণ করা হয়েছে। সেদিন সকল ডাইয়োসিসে সমস্ত ধর্মপল্লীতে বিশেষ প্রার্থনা, খ্রিস্টযাগ, উপদেশ ও অন্যান্য কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়। খ্রিস্টযাগ প্রাকৃতিক পরিবেশ, গ্রোটো বা লাউদাতো সি বাগানে আয়োজন করতে পারলে আরও অর্থপূর্ণ হবে। খ্রিস্টযাগের পরে কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন- কাপড়ের ব্যাগ বিতরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অংশগ্রহণ, ময়লা-আবর্জনা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কিছু উদ্যোগ  ইত্যাদি।

৫. একই সাথে স্থানীয়ভাবে “লাউদাতো সি সপ্তাহ-২০২২” সক্রিয়ভাবে উদ্যাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করা যায়। কাথলিক মণ্ডলী ছাড়াও অন্যান্য মণ্ডলীকে উৎসাহিত করা হবে যেন নিজেদের আয়োজনে “লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম” কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। আগামী মে ১৫ থেকে ২৯, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, আন্তঃমাণ্ডলিক , আন্তঃধর্মীয়, পরিবেশবিদ, পরিবেশ সংরক্ষণকর্মী ও সংগঠনের অংশীজনদের উপস্থিতিতে "Sharing the Good Practices"  আলোচনা সভা আয়োজন করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। আলোচনার অনুধ্যান ও অনুধাবন লিপিবদ্ধ করে পরবর্তী কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ সহায়ক হতে পারে। সিবিসিবি পর্যায়েও একটি আলোচনা সভা আয়োজন করতে যাচ্ছে।

৬. পৃথিবী নামক গ্রহটির যে-অবনতি ঘটছে তা ব্যক্তিগতভাবে ও দলগতভাবে নিজের জন্য বেদনায়ক কষ্ট বলে অনুভব করা এবং আমরা প্রত্যেকে এ বিষয়ে কী করতে পারি তা আবিষ্কার করতে একটি আন্তরিক “পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক মন পরিবর্তন’ এর সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। পোপ ফ্রান্সিস সৃষ্টির বিরুদ্ধে আমাদের পাপ স্বীকার করার আহ্বান ও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন- কারণ আমরা সবাই পরিবেশের কমবেশি ক্ষতিসাধন করেছি। ঈশ্বরের সৃষ্টির জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করেছি, আবাহাওয়া পরিবর্তন করেছি, বনজঙ্গল ধ্বংস করেছি, জলাভূমির পবিত্রতা বিনষ্ট করেছি, জমিজমা, বাতাস ও জীবন ধ্বংস করেছি- এসবই পাপ। কেননা প্রাকৃতিক জগতের বিরুদ্ধে পাপ করার অর্থ আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে পাপ করা এবং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ করা (লাউদাতো সি, অনুচ্ছেদ-৮)।

৭. ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর এবং পোপ ফ্রান্সিস কর্তৃক বাংলাদেশ কাথলিক মণ্ডলীর ‘একজন খ্রিস্টভক্ত, একটি বৃক্ষরোপণ’ উদ্যোগটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে, আরও প্রস্তাব করেছেন- বর্তমানে কার্বন নিঃসরণ কমানো উদ্যোগটি গ্রহণ বাস্তবসম্মত। বিভিন্ন ডাইয়োসিসে ধর্মপল্লী ও প্রতিষ্ঠানসমূহর পাশাপাশি বিসিএসএম, যুবসংগঠন, ক্লাব ও ক্রেডিট ইউনিয়নের অংশগ্রহণ খুবই উজ্জ¦ল ছিল। সুতরাং বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে বাস্তবে কী হয়েছে, কী অবস্থায় আছে, কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা ডাইয়োসিস পর্যায়ে ফিরে দেখা দরকার। একটি প্রতিবেদনও তৈরি করা প্রয়োজন।

৮. জাতীয় ও ডাইয়োসিস পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক সংলাপ ও ফোরাম আয়োজন করার তাগিদ অনুভব করা হয়েছে। যেখানে আন্তঃধর্মীয়, আন্তঃমাণ্ডলিক, বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান যেমন- ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), হিন্দু-বোদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, চার্চসমূহ এবং আরো পরিবেশ বিষয়ক সংগঠনের অংশগ্রহণ থাকতে পারে। পরিবেশবিদ ও পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীদের সাথে নেটওয়ার্কিংএ যোগদান করা- যেমন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), আদিবাসী  ফোরাম বাংলাদেশ, কারিতাস, ওয়ার্ল্ড ভিশন এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের আরো সংগঠনের সাথে জড়িত থাকা। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং চলমান রাখার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন- The Dicastery for Promoting Integral Human Development-Vatican, Migration and Refugee Section-Vatican, The Federation of Asian Bishops’ Conferences (FABC –OHD-CCD), The River Above Asia Oceania Ecclesial Network (Raoen), Laudato Si Movement, International Catholic Migration Commission (ICMC), Asia Pacific Justice and Peace Worker Network (APJP WN), Talitha Kum Vatican and Talitha kum Asia.

৯. কাথলিক শিক্ষা বোর্ডের সহযোগিতায় কাথলিক স্কুলসমূহকে কেন্দ্র করে অন্যান্য স্কুলের শিক্ষকমণ্ডলী ও ছাত্র-ছাত্রীদের এ বিষয়ে ব্যাপকতর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদান করা যায়। পোষ্টার তৈরী, ডকুমেন্টরি তৈরী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতা ও র‌্যালী আয়োজনে যুবক-যুবতী ও ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পৃক্ত করা যায়।  কারিতাসের ট্রাস্ট- কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (সিডিআই) কর্তৃক ‘লাউদাতো সি’ পত্রটির আলোকে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক’ একটি সংক্ষিপ্ত মডিউল তৈরি যায়। তাদের আয়োজিত প্রশিক্ষণসমূহে বিষয়টি সংযুক্ত করতে পারে এবং আলাদা একটি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

১০. বিশ্বজগতের মা মারীয়া তিনি দীনদরিদ্রদের কষ্টে ও ক্ষতবিক্ষত জগতের সকল প্রাণীর জন্য দুঃখশোকে কাতর। তাঁর নিকট সবিনয় প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদেরকে প্রজ্ঞার দৃষ্টি দিয়ে জগৎকে দেখার শক্তি দেন। পবিত্র পরিবার ও বিশ্বজনীন মÐলীর রক্ষাকর্তা সাধু যোসেফ আামদের শেখাতে পারেন- কিভাবে সেবাযতœ দিতে হয় এবং বসতবাটি রক্ষা করার জন্য কিভাবে উদারভাবে পরিশ্রম করতে হয়। যীশু বলেন- “আমি এখন সব-কিছুই নতুন ক’রে তুলছি” (প্রত্যাদেশ ২১:৫)। এই গ্রহটির জন্য আমাদের ভাবনা-চিন্তা যেন আমাদের প্রত্যাশার আনন্দ বিনষ্ট করতে না পারে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের মাঝে নিত্য উপস্থিত, কখনো পরিত্যাগ করেন না, একা ফেলে রেখে যান না। এই পৃথিবীতে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নতুন নতুন পথ ও পন্থা খুঁজে পাওয়ার জন্য তিনিই প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দান করছেন, আসুন ধ্যান-প্রার্থনায় তা শুনি ও এখনই কাজে সক্রিয় হই (লাউদাতো সি ২৪৩-২৪৫)। আমরা পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে দায়বদ্ধতা স্বীকার করি; দায়বদ্ধতার ভিত্তি হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার ওপর সৃদৃঢ় বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতা। 

ইতোমধ্যে অনেক ব্যক্তি, ডাইয়োসিস, সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মসংঘ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করছেন। আমাদের অর্জনসমূহ সমবেতভাবে সহভাগিতা করার পরিবেশ তৈরীর উদ্দেশ্যে ‘লাউদাতো সি সপ্তাহ-২০২২’ এর মূলভাবটি “শোনা এবং সাথে পথচলা” খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যার যার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ক সেবাকাজ আরো গতি পাবে। সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক গন্ডি ত্যাগ করে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য একসাথে কাজ করা অধিকতর কল্যাণকর হবে। অন্যথায় মাশুল দিতে হবে আগে না হোক অদূর ভবিষ্যতে। আমরা বিশ্বাস করি পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ মহান কিছু অর্জন সম্ভব হবে। ধরিত্রীর বুকে আনবে নতুন ছন্দ, জাগাবে নতুন আশা। আসুন, একসাথে, একত্রে ‘লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম’ উদ্যোগে আগামী ৭ বছর নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ অবিরত চালিয়ে যাই; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি; আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ সুন্দর নির্মল পৃথিবী গড়ে তুলি। তাঁর প্রশংসা ও মহিমা হোক - লাউদাতো সি!


বিশপ জের্ভাস রোজারিও ডিডি, সভাপতি, ন্যায় ও শান্তি কমিশন, বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী

ফাদার লিটন হিউবার্ট গমেজ, সিএসসি , সেক্রেটারি, ন্যায় ও শান্তি কমিশন, বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী




শনিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২১

সৃষ্টি উদযাপন কাল - ২০২১: আমাদের অভিন্ন বসতবাটি পুনরুদ্ধার

সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা, তোমার প্রশংসা হোক। পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার্থে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' পালন করতে আহ্বান করেছেন। এই কালটির একটি বিশেষ তাৎপর্য হল ১ সেপ্টেম্বর (বুধবার) 'সৃষ্টির সেবাযত্নে বিশ্ব প্রার্থনা দিবস' পালনের মাধ্যমে শুরু হবে এবং ৪ অক্টোবর 'আসিসির সাধু ফ্রান্সিসের পর্ব দিবস' উদযাপনের মাধ্যমে সমাপ্তি হবে। এবছর প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে 'আমাদের অভিন্ন বসতবাটি পুনরুদ্ধার' গ্রহণ করা হয়েছে। 

'সৃষ্টি উদযাপন কাল' পালনের একটি বিশিষ্ট সর্বজনীন অনু্প্রেরণা মাত্রা রয়েছে। এসময়ে আমরা পিছনে ফিরে তাকাই এবং  ধন্যবাদ জানাই প্যাট্রিয়ার্ক প্রথম দিমিট্রিওসকে যিনি ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে  বিশ্বের সকল পরিবার একত্রে আমাদের অভিন্ন বসতবাটির যত্ন ও সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা ও বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণের একটি মাস উদযাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন থেকে 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' ও সর্বজনীন প্রেরণা সকলের মধ্যে বিদ্যমান বয়েছে। সকল পরিবারকে একত্রে সৃষ্টির জন্য প্রার্থনা, সৃষ্টির সেবাযত্ন বিষয়ক অনুধ্যান ও সৃষ্টি রক্ষণাবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে একসাথে 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' অর্থপূর্ণ করতে আহ্বান করেছেন। ধমৃগুরু পোপ ফ্রান্সিস গুরুত্বের সাথে জরুরীভিত্তিতে সৃষ্টির সঙ্গে ও একে অপরের সাথে সর্ম্পকের নিরাময় করতে বিশ্ব পরিবারকে উৎসাহিত করছেন এবং সকলকে একইভাবে অংশগ্রহণ করতে আহ্বান করছেন "কেননা আমরা জানি যে, পরিবর্তন সম্ভব" (লাউদাতো সি, অনু. ১৩)।

ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন' নামক পুণ্য দপ্তর পুুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিসের আহ্বানকে সফলতা দান করতে আগামী ৭ বছর (২০২১-২০২৭ খ্রিস্টাব্দ) সময়কে 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে এবছর থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে ধরিত্রীর বাস্তুতন্ত্র অর্থাৎ ‘প্রকৃতি-পরিবেশ পুনরুদ্ধার দশক’ (২০২১-২০৩০ খ্রিস্টাব্দ) কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসময় জনগণ আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব সম্মিলনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একটি আগামী অক্টোবর ১১-২৪ তারিখে চীনে জাতিসংঘ কর্তৃক আয়োজিত 'জীববৈচিত্র্য বিষয়ক শীর্ষ-বৈঠক' ‘কপ-১৫’ (COP15); অপরটি আগামী নভেম্বর ১-১২ তারিখে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জাতিসংঘ আয়োজিত 'জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক শীর্ষ-বৈঠক' ‘কপ-২৬’ (COP26)। ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর আশা করছে খ্রিস্টভক্তগণ প্রকাশ্যভাবে 'অভিন্ন বসতবাটি পুনরুদ্ধার' বিষয়টি শীর্ষ-বৈঠকসমূহে নিজেদের মতামত জোড়ালোভাবে ব্যক্ত করবে। এ জন্য ‘সুস্থ ধরিত্রী, সুস্থ জনগণ আবেদন’ (Healthy Planet, Healthy People Petition) সংযুক্ত পত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহে ‘লাউদাতো সি মূভম্যানট’ ও জোটসমূহ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, যা হবে আমাদের 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' পালনের একটি অন্যতম পদক্ষেপ। 

এসময়ে ‘লাউদাতো সি’ সর্বজনীন পত্রটির ৭টি লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায় করা হবে। লক্ষ্যসমূহ হল- জগতের আর্তনাদে সাড়াদান, দীনদরিদ্রদের আর্তনাদে সাড়াদান, পরিবেশগত অর্থনীতি বিস্তার, সহজ-সরল জীবনধারা, পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ক শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্দীপ্ত আধ্যাত্মিকতা এবং সমাজকে সম্পৃক্তকরণ ও অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি। লক্ষ্য অর্জনের জন্য  গোটা মণ্ডলীকে সাতটি কর্মক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে- পরিবার, ধর্মপল্লী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ক্লাবসমূহ, সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং ধর্মীয় সংঘসমূহ ইত্যাদি। করোনাভাইরাস শিখিয়েছে মানুষ সচেতন হয়ে ‘স্বভাব’ পালটাতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব।  আমাদের অভিন্ন বসতবাটির অবনতির বিষয়টি আমাদের জীবনধারা পরিবর্তন করার দাবি জানায় ফলে মানব পরিবারের আচরণে আমূল পরির্তনের জরুরি প্রয়োজন (লাউদাতো সি, অনু. ২০৬, ৪)। 

কাথলিক মণ্ডলী ও কারিতাস একত্রে ৭ লাখ বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিগত বছর ব্যক্তিগত ও সমবেত উদ্যোগে শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী ও প্রাপ্তবয়স্ক অনেকে সৃষ্টির সেবাযত্নে নিয়মিত প্রার্থনা, ভার্চুয়াল সভা-সেমিনার, লেখালেখি, বন ও বসতবাটি রক্ষণাবেক্ষণে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন (বিশেষভাবে ময়মনসিংহ ও সিলেট), বৃক্ষরোপণ, করোনাভাইরাস মহামারীতে দীনদরিদ্রদের আর্তনাদে সাড়াদান, নিজ নিজ বসতবাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাগান করা, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ, আবর্জনা সঠিক ব্যবস্থাপনা, দূষণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা, ব্যয় সংকোচন, ঋণ পরিশোধ এবং জৈবসুরক্ষাসহ বহুবিধ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন এবং সামাজিক গণমাধ্যমে কেউ কেউ সহভাগিতা করেছেন। আমাদের অভিন্ন বসতবাটির সেবাযতত্ন ও ফলপ্রসূতা নিশ্চিত করতে বিগত দিনগুলোতে আপনাদের বহুবিধ সৃজনশীল উদ্ভাবন উদ্যোগ ও উপায়ের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর আশা করছে পোপ ফ্রান্সিস এর আহ্বানে প্রতিটি ডাইয়োসিস ও ধর্মপল্লী বহুবিধ সৃজনশীল উদ্ভাবন  উদ্যোগ চলমান রাখবে-

১. সেপ্টেম্বর ১ তারিখ বুধবার ‘সৃষ্টির সেবাযযত্নে বিশ্ব প্রার্থনা দিবস’ এবং 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' (১ সেপ্টেম্বর - ৪ অক্টোবর) সৃষ্টি জন্য  প্রার্থনা করতে পারি। এই প্রার্থনা পরিবার, ক্ষুদ্র দল, সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মপল্লী, ধর্মব্রতীদের গৃহ, সেমিনারি,  সংগঠন এবং সর্বজনীন হতে পারে;

২. যাজকগণ প্রতিটি ধর্মপল্লীতে 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' এর প্রতি রবিবার দিন (সেপ্টেম্বর ৫, ১২, ১৯, ২৬, অক্টোবর ৩ এবং ৪ আসিসির সাধু ফ্রান্সিসের পর্ব দিবস) পবিত্র খ্রিস্টযাগের উপদেশে বিশেষ সহভাগিতা (‘আমাদের অভিন্ন বসতবাটি পুনরুদ্ধার’) করতে পারেন;  

৩. আমাদের সবারই করণীয় আছে- নিজের ঘরের বাতিটা অকারণে না জ্বালানো, গাড়ি কম চালানো, অযথা মোটরসাইকেল না চালানো, গাছ লাগানো, বাগান করা, সৃষ্টির যত্ন নেয়া, পানি পরিমিত ব্যবহার করা, অযথা বিকট শব্দ না করা, নির্মল বায়ু সেবন করা, দূষণ বা নোংরামী থেকে বিরত থাকা ও জৈবসুরক্ষার মতো কাজগুলো সকলেই করতে পারি; 

৪. ক্ষুদ্র দলে সভা, সেমিনার, কর্মশালা ও তৃণমূল পর্যায়ে পরিবেশ সুরক্ষার্থে বিভিন্ন কর্মসূচী- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও গাছ লাগানোর অভিযান, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন, পরিবেশ বিষয়ক লেখালেখি বা পাঠ করা;

৫. সম্প্রতি পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন- ’লাউদাতো সি’ পত্রটি কেবল ‘সবুজ প্রৈরিতিক পত্র নয়’ (green Encyclical) বরং একটি ‘সামাজিক প্রৈরিতিক পত্রও’ (social Encyclical)। তাই অশান্তি, কোন্দল, অন্যায্যতার মত বিভিন্ন নোংরামী নিরসন ও সংলাপ এবং দীনদরিদ্রদের আর্তনাদে সাড়াদানে বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচী গ্রহণ করা যায়;

৬. শীর্ষ-বৈঠক (কপ-১৫ ও কপ-২৬) দু’টিতে নিজেদের মতামত জোড়ালোভাবে ব্যক্ত করতে ‘সুস্থ ধরিত্রী, সুস্থ জনগণ আবেদন’ সংযুক্ত  পত্রে স্বাক্ষর প্রদানে মাধ্যমে শীর্ষ-বৈঠকসমূহে অবদান রাখতে পারি (Link: Healthy Planet, Healthy People Petition, Sign the petition);

৭. খ্রিস্টবিশ্বাসী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগণের হয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে প্রাবক্তিক ভূমিকা পালন করা এবং তাদের পক্ষে অ্যাডভোকেসি করা। আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগণের গণ-উদ্যোগসমূহকে জোরদার ও ইতিবাচকভাবে গণমাধ্যমসমূহে প্রচার, প্রকাশ ও সার্বিক সহযোগিতা করা দরকার। 

আমাদের এই ধরিত্রী কারও একার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, ধরিত্রী মূলত একটি যৌথ উত্তরাধিকার, যার সুফল ভোগ করার অধিকার সবারই আছে (লাউদাতো সি, অনু. ৯৩)। পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এক বার্তায় জোর দিয়ে বলেছেন- ‌"আসুন, একসাথে কাজ করি, কেবলমাত্র আমরা এইভাবেই আমাদের ভবিষ্যতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই ধরিত্রী গড়তে সক্ষম হবো, এটাই আমাদের আশা। আসুন, আমরা আমাদের মাতৃভূমির যত্ন নিতে এগিয়ে আসি; ... আসুন, পৃথিবী এবং সৃষ্টির উপহারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই; আসুন, আমরা এমন একটি জীবনযাত্রা এবং এমন একটি সমাজের উদ্বোধন করি যা শেষ পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব ও  টেকসই পরিবেশ হয়। সবার জন্য আরও একটি সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দিতে আমাদের সুযোগ রয়েছে। পিতা ঈশ্বরের নিকট থেকে আমরা একটি সুন্দর বাগান পেয়েছি, আমাদের  সন্তানদের জন্য আমরা একটি মরুভূমি রেখে যেতে পারি না।" আসুন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ও নিবেদিতপ্রাণ অংশীজন হিসেবে বহুবিদ ও বিচিত্র সৃজনশীল উদ্ভাবন উদ্যোগ ও উপায়ে সৃষ্টিকর্তার অমূল্যদান 'আমাদের অভিন্ন বসতবাটি পুনরুদ্ধার' করতে অবিরত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই। 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।




সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে আমাদের আচরণবিধি

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৭২ সালে ৫ জুন এ দিনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তবে  ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়ে আসছে। চলতি বছর দিবসটি উদযাপনের  বিষয়বস্তু ধরিত্রীর বাস্তুতন্ত্র অর্থাৎ প্রকৃতি-পরিবেশ ‘পুুনর্মূল্যায়ন, পুনগঠন, পুনরুদ্ধার’ (Reimagine, Recreate, Restore) করা। তবে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের পরিবেশ দিবসটির আরেকটি গুরুত্ব আছে- আজ থেকে জাতিসংঘের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশকও (২০২১-২০৩০) শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, এত দিন ধরে আমরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ আমাদের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সমন্বিত পরিবেশের যে ক্ষতি করেছি, তা পুনরুদ্ধারের জন্য বিশ্বের সব কটি রাষ্ট্র আগামী এক দশক ধরে চেষ্টা করবে। 

পরিবেশ সুরক্ষার্থে ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পুুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর আহ্বানকে সফলতা দান করতে আগামী ৭ বছর সময়কে "লাউদাতো সি কর্মসূচি প্লাটফর্ম" ঘোষণা করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে, পরিবার, ধর্মপল্লী, পালকীয় সেবা কমিশনসমূহ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, সেমিনারী, ব্রাদার হাউজ, সিস্টারদের কনভেন্ট, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং দলগতভাবে নিজেদের কিছু সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অঙ্গীকার ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে আহ্বান করেছেন। তবে আমাদের প্রত্যেকজনকে জানা দরকার, আমাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র বা প্রকৃতি-পরিবেশ কেমন আছে? আর কী করলে এর পুনরুদ্ধার সম্ভব? আমার দায়িত্বটা কীভাবে আমি পালন করতে পারি। আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে পোপ ফ্রান্সিস এর সর্বজনীন পত্র ‘লাউদাতো সি’ এর অনুপ্রেরণায় করণীয় কিছু উপলব্ধি ও কিছু সুপারিশ এখানে প্রদান করা হল যা নিজেদের জন্য একটি "অভিন্ন বসতবাটি সুরক্ষা আচরণবিধি" তৈরি করতে সহায়তা করবে। 

১. নিজের বেদনাদায়ক কষ্ট অনুভব- অন্তরে গভীরভাবে উপলব্ধি করি আবর্জনা এখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলে অপরিচ্ছন্ন-অস্বাস্থ্যকর নর্দমা তৈরি করেছি; গাছ কেটেছি কিন্তু রোপনে অবহেলা করে পরিবেশে ভারসাম্য নষ্ট করেছি; স্বার্থপরতা ও অতিভোগের কারণে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ করে ফেলেছি; প্রতিনিয়ত প্রচুর পানি অপচয় করছি, খাল ও নদীর জল বিষাক্ত করে ফেলেছি; এভাবে প্রকৃতি ও প্রতিবেশীদের প্রতি অনেক ক্ষতি  ইতোমধ্যে করেছি। এসব স্মরণ করে অনুতপ্ত হই ও মন-পরিবর্তন করি  এবং প্রকৃতি ও  প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অঙ্গীকার করে পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর সাথে আধ্যাত্মিকভাবে একাত্ম থাকি। 

২. সৃষ্টির মঙ্গলবার্তা বিশ্বাস- আমাদের আশা হল- ঈশ্বর, যিনি শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি পৃথিবীতেও হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং সব ধরনের অমঙ্গলকে পরাস্ত করতে পারেন। তিনি আমার, আপনার সহযোগিতায় তা করতে চান। আজ থেকেই আমার ও আপনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপে বড় কিছু অর্জন সম্ভব, কেননা আমরা জানি যে পরিবর্তন সম্ভব; এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা;

৩. সৃষ্টি-কেন্দ্রিক উপাসনা প্রস্তুত- যারা পরিবেশ সংরক্ষণ ও বাস্তব্যবিদ্যা গবেষণা করেন তাদের প্রতিপালক আসিসির সাধু ফ্রান্সিস এর মধ্যস্থতায় প্রার্থনা করতে পারি; সৃষ্টি-কেন্দ্রিক বা লাউদাতো সি উপাসনা উদযাপনকে উৎসাহিত করতে পারি এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন করা যায়; 

৪. পরিবারের যত্ন- আমি যেখানে বসবাস করছি সেটা একটি পরিবার; আমাদের পরিবার হল সৃষ্টি ও প্রকৃতির একটি অংশ; পরিবারের আরো বেশী যত্ন নিব। খাবারের সময়, অবসর সময়ে অথবা বিনোদনের সময়ে প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং দীনদরিদ্রদের অবস্থা নিয়ে সহভাগিতা করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং গরীবদের জন্য ভাল কিছু উদ্যোগ নিতে সন্তানদের উৎসাহিত করা যায়;

৫. তিনটি ‘পি’ (three P’s)- ‘লাউদাতো সি’ পত্রটির নিবিড় সমন্বয় ও কার্যকরী সাড়াদানের ক্ষেত্রে তিনটি ‘পি’ (three P’s) অনুধ্যানে করণীয়সমূহ স্মরণ করতে পারি- plant বা গাছ-গাছড়া লাগানো, protect বা রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও promote বা সংবর্ধিত করা অর্থাৎ ‘লাউদাতো সি’র মাণ্ডলিক শিক্ষা সকলের নিকট প্রকাশ ও প্রচার করা;

৬. পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা- নিজের দেহ থেকে শুরু করে জামাকাপড়, ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, সমাবেশস্থল, প্রভৃতির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা; সন্তানদেরও অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করবো। বাড়ির চারিপাশের প্লাস্টিক, নর্দমা ও আবর্জনা পরিস্কার করতে উদ্যোগ গ্রহণ ও নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা যায়;

৭. অপচয়রোধ ও ঋণ পরিশোধ- প্রয়োজন মাফিক কেনাকাটা, পরিমিত রান্না করা; প্রয়োজন অতিরিক্ত খরচপাতি, জিনিসপত্র ও দ্রব্যসামগ্রীর অপব্যবহার, ভোজনবিলাস ও অতি ভোগের মানসিকতা বর্জন করা; বাড়িতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিভিশন, এসি, পানির কল, বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের পর বন্ধ রাখাতে সর্বদা সচেতন থাকব। ক্রেডিট ইউনিয়নসহ সকল প্রকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা; ঋণ গ্রহণ করে বিনোদন বা উৎসব আয়োজন থেকে বিরত থাকা;

৮. স্বাস্থ্যসম্মত খাবার- শাকসবজি, ফুল ও ফলের বাগান করা এবং খাবার হিসেবে ব্যবহার করা। প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান করা; মাংস গ্রহণ পরিমিত করা, পরিমিত পরিবেশন ও পরিমিত ভোগ, দেশীয় পণ্য ব্যবহার করার মনোভাব তৈরি করা; 

৯. বাগান ও জৈবসার- রান্নাঘরের অবশিষ্টাংশ, পাতা-লতা ও আবর্জনাগুলি মিশ্রিত করে উত্তম সার তৈরি করা যায় এবং এসব গাছের বৃদ্ধিতে আরও ভাল সার হিসেবে সহায়তা করে। গ্রামের বাড়ির আঙ্গিনায় অথবা শহরে বাসাবাড়িতে টবে বারান্দায় বা ছাদে অথবা জানালার পাশে অথবা কর্মস্থলে শাক-সবজি-ফুল বাগান তৈরি করা ও নির্ধারিত গাছ, শাক-সবজি বা ফুলগাছ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সন্তানদের দায়িত্ব বন্টন করা; 

১০. দূষণমুক্ত পরিবেশ- শব্দ, বায়ূ, জল এবং সকল প্রকার দূষণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা; গণপরিবহন ব্যবহার করা এবং পরিবহনের দূষণকারী কর্মক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে; 

১১. পানি অপচয়রোধ- যারা পানীয় জলের চরম সংকটে আছে তাদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে আমরা  স্নানে পরিমিত পানি ব্যবহার বা আগের চেয়ে একটু কম পানি ব্যবহার করা, হাতমুখ ধোয়ার সময় কলের পানি নষ্ট না করি, যতটুকু পান করতে চাই ততটুকু পানি গ্লাসে ঢেলে পান করতে পারি। আমাদের এমন ক্ষুদ্র ক্ষ্রদ্র অভ্যাস পানি অপচয় অনেক হ্রাস করবে; 

১২. প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা- আমরা এমুহূর্তে প্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারছি না তাই সঠিকভাবে ব্যবহার ও প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পলিথিন ব্যাগ একেবারেই বাদ দিতে হবে কারণ এর ক্ষতির ধরন বহুমাত্রিক এবং বাড়ছে- মাটি নষ্ট করে জমিতে ফসল উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করছে, শহরে নর্দমা বের হওয়ার পথ বন্ধ করে ব্যাপক ক্ষতি করছে এবং আগুনে দিলে গ্যাস হয়ে বায়ুদূষণ করে মানবদেহের সংঘাতিক ক্ষতি করবে; 

১৩. কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহার- পাটের তৈরি চটের ব্যাগ অথবা ভারী ও শক্ত কাপড় পুনঃব্যহার করে ব্যাগ তৈরি করে বাজারে বা বাড়ির নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়;

১৪. পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা- লাউদাতো সি পত্রটির অনুপ্রেরণায় সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক শিক্ষা বিস্তার করা সম্ভব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ডাইয়োসিস, ধর্মপল্লী, ক্লাব, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, পরিবারে, যোগাযোগ মাধ্যমে, ধর্মশিক্ষাদানে ও অন্যত্র। পরিবেশগত সচেতনতা এবং কর্মকাণ্ড তৈরি লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবেশগত চেতনায়নমূলক শিক্ষা পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করতে পারে; 

১৫. পরিবেশ বিষয়ক বই ও পত্রিকা পড়া- ব্যক্তিগতভাবে এবছর পরিবেশ বিষয়ক একটি বই পড়ার অঙ্গীকার করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের গ্রাহক হয়ে পাঠ করা; লাউদাতো সি বিষয়ক একটি শিক্ষা সেমিনারে অংশগ্রহণ করা; যা যা নতুন শুনছি তার কিছু অংশ মনে রাখতে চেষ্টা করা। আমরা যা শুনি তার মাত্র ১০ শতকরা এক বছর পর মনে রাখতে পারি। আগ্রহ অটুট থাকলে মনে রাখার শতকরা হারও বাড়বে;

১৬. অভিজ্ঞ সহায়ক নিমন্ত্রণ- নিজেদের সংঘের, বা প্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহণকারী অংশীজনের সাথে আপনার শিক্ষণ সহভাগিতার ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে আপনাকে সহায়তা করতে বাইরে থেকে অভিজ্ঞ সহায়ক বা বক্তা ডেকে আনুন;

১৭. নিজে জানুন ও অন্যকে জানান- আমাদের দেশে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে সরকার কাজ করছে, দেশী সংস্থা কাজ করছে, বিদেশী সংস্থা কাজ করছে। তাদের কাজ সম্পর্কে জানা ও অপরকে জানানো, তাদের কাজে সহযোগিতা করা। প্রকৃতি ও পরিবেশ বা 'লাউদাতো সি' বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জোটে (networking) যোগ দিন; নিজের চেষ্টায় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ, ফলাফল ও প্রতিরোধ সম্পর্কে আরো বেশী করে জানুন। পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে মণ্ডলীর শিক্ষা কী, মহামান্য পোপ মহোদয় বার বার কী আহবান রাখছেন- তা জানুন;

১৮. একজনকে দায়িত্ব প্রদান- আপনার সংঘে বা প্রতিষ্ঠানে এমন একজনকে বাছাই করুন যে কী না আপনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আগামী বছর এই বিষয়ে নিজে আরো জানবেন, সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের সকলকে জানাবেন ও বাইরে অন্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন; 

১৯. সহভাগিতা ও আলোচনা- আপনার যা যা নতুন শিক্ষণ (learning) তা তা আপনার সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার অংশীজনদের (stakeholders) জানান। যেসমস্ত চিঠি, দলিল, লেখা পাচ্ছেন তা সহভাগিতা করুন, তাদের কেন জানাচ্ছেন তা-ও ব্যাখ্যা করুন। আপনার প্রত্যাশা খুলে বলুন। কোনো নিয়মিত সভায় সকলের সাথে এই বিষয় আলাপ করতে ঘন্টাখানেক সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে;

২০. কর্মস্থলে সচেতনতা- কর্মস্থলে প্রয়োজন ছাড়া কাগজে প্রিন্ট না করা, প্রয়োজনে কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট করা এবং সুযোগ থাকলে কাগজ পুনঃব্যবহার করতে পারি; কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য অফিস সরঞ্জামসমূহ ব্যবহারের পরে বন্ধ রাখব; দলীয়ভাবে গাড়ী ব্যবহার করার মাধ্যমে কার্বন ব্যবহার হ্রাস করতে পারি; 

২১. সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ- কর্মস্থলে ‘ধন্যবাদ’ ও ‘স্বাগত’ এমন সৌজন্যসূচক শব্দ ব্যবহার, ইতিবাচক কথা বলা, ইতিবাচক শব্দ ব্যবহার, নোংরা শব্দ পরিহার, সমালোচনামূলক কথা না বলা, বিচারকি কথা-বার্তা পরিহার কর্মপরিবেশ সুন্দর রাখে। অযাচিত চাটুকারিতার স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা; কাজের সময় অযথা অন্যের নিকট বসে সময় নষ্ট না করা বরং তাকে কাজ করতে দেয়া এবং নিজে ভাল কাজ করা, কাজে সৃজনশীল চিন্তা করা, অবসর সময়ে উদ্দীপনামূলক লেখা পড়ে নতুন চিন্তা আহরণ করা; 

২২. সত্য মতকে সত্যরূপে গ্রহণ- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিত্তিহীন গুজব ও ‘মতের অরণ্য’ থেকে  বেরিয়ে এসে মূলধারার গণমাধ্যমের উপর নির্ভর করা যেন যথার্থ আনন্দ, গভীর তৃপ্তি, প্রকৃত সত্য আহরণ করা যায়;

২৩. ছুঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি বর্জন- অর্থনীতি, উৎপাদন ও জিনিসপত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে- সংগ্রহ কর-চাহিদা পূরণ কর-ছুঁড়ে ফেলার (take-make-dispose) বর্তমানযুগে প্রচলিত উন্নয়নের মডেলের পরিবর্তে লাউদাতো সি'র অনুপ্রেরণা- পুনর্নবীকরণ-পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ-অন্যের সাথে সহভাগিতার (renew-remake-share) রূপান্তরশীল প্রক্রিয়া প্রচলন ও অনুুসরণ করা;

২৪. পবিত্র আহ্বান হিসেবে গ্রহণ- নিজের কল্যাণের কথা ভেবেই প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশীর সুরক্ষা সুসংবাদটি পবিবারের আপনজন ও বন্ধুবান্ধবদের জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই এটি পবিত্র একটি আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করা যায়;

২৫. নিজের অংশগ্রহণটা অপরিহার্য- যদি ভাল কিছু করি তবে ‘আরো ভাল’ কিছু করতে চেষ্টা করি, যদি আরো ভাল কিছু করে ফেলেছি তবে ‘উত্তম কিছু’ করতে চেষ্টা করি, আর যদি উত্তম কিছু করে থাকি তবে ‘অতি উত্তম কিছু' করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারি;

২৬. সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন- সকল পযায়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল থাকা দরকার। যেমন- প্রথমত, সমন্বিত পরিবেশ সরক্ষার্থে বিভিন্ন বাসস্তুতন্ত্র বা প্রকৃতি-পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বর্তমান সঠিক অবস্থা জানা থাকতে হবে এতে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, লোকজ জ্ঞানের সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের সমন্বয় করে পরিকল্পনা সাজানো দরকার। কারণ পৃথিবীব্যাপী প্রতিবেশ রক্ষায় লোকায়ত জ্ঞান, স্থানীয় সংরক্ষণ পদ্ধতি, জনগোষ্ঠীভিত্তিক সংরক্ষণ উদ্যোগগুলো বড় ভূমিকা রাখছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয়ত, স্থানীয় ও আঞ্চলিক সুরক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দেওয়ার সময় এখনই, সবাইকে তা মানতে হবে। প্রকৃতিকেন্দ্রিক ও জবাবদিহিমূলক মনিটরিং ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং তবেই সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষনের সুফল পাওয়া যাবে।

২৭. অবিরত প্রার্থনা করি- যদি কিছুই করতে না পারি তবে পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে সরাসরি যারা জড়িত তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তেনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের জন্যেও প্রার্থনা করুন। দীনদরিদ্র মানুষ যারা অমানবিক ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন তাদের জন্য প্রার্থনা অব্যাহত রাখুন। এই বিশ্ব জানতেও পারেনা প্রার্থনায় যে কতো আশ্চর্য্য কাজ হয়!     

করোনাভাইরাস মহামারী শিখিয়েছে আমাদের আরও বেশি যত্নবান ও রক্ষণাবেক্ষণ মনোভাব প্রয়োজন। পোপ মহোদয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা ‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ উদযাপন করছি। ইতোমধ্যে অনেকে নীরবে কাজ করে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেছি। ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পোপ ফ্রান্সিসের এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে আগামী ৭ বছর অবিরত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করবে। আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ  "অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি" অনুসরণ করি তবেই মহান কিছু অর্জন সম্ভব হবে। ধরিত্রীর বুকে আনবে নতুন ছন্দ, জাগাবে নতুন আশা; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।

মঙ্গলবার, ২৫ মে, ২০২১

লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম


'লাউদাতো সি' সর্বজনীন পত্রটির ৭টি লক্ষ্য

১. 'লাউদাতো সি সপ্তাহ-২০২১' (মে ১৬-২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ) এর সমাপ্তি দিবসে মে ২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দে ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তরের প্রধান কার্ডিনাল পিটার টার্কসন সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণে আগামী ৭ বছর সময়কে 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' (Laudato Si Action Platform-LSAP) হিসেবে  ঘোষণা করেছেন। কার্ডিনাল মহোদয় বলেছেন- 'লাউদাতো সি' সর্বজনীন পত্রটি প্রকাশিত হওয়া থেকে আজ ছয় বছর অবধি জগতের ও দীনদরিদ্রদের আর্তনাদ দিন দিন আমাদের কাছে আরও হৃদয় বিদারক হয়ে উঠেছে। আমাদের বিজ্ঞানী এবং তরুনদের বার্তা ক্রমবর্ধমানভাবে উদ্বেগজনক- 'আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি।'

২. 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' বহুমাত্রিক সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়ে সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণের দিকে সাত বছরের যাত্রা। কার্ডিনাল বলেছেন- এই সাতটি বছর হবে সক্রিয় কর্মসূচিভিত্তিক একটি যাত্রা, তবে এখন আগের চেয়ে আরো বিস্তর কাজ করার সময়; সুনির্দিষ্ট বহুমাত্রিক সৃজনশীল কর্মসূচি গ্রহণের সময় এখনই। কার্ডিনাল মহোদয় 'লাউদাতো সি' সর্বজনীন পত্রটির সাতটি লক্ষ্য ব্যাখ্যা করেছেন-

(ক) জগতের আর্তনাদে আমাদের সাড়াদান অর্থাৎ পৃথিবী নামক বাগানটি চাষ করা, যত্ন নেওয়া, তত্ত্বাবধান করা, সুরক্ষা করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা (আদি ২:১৫); 

(খ) দীনদরিদ্রদের কান্নায় আমাদের প্রতিক্রিয়া অর্থাৎ আমরা সকলে মিলে একটি মাত্র মানবপরিবার, অভিন্ন বসতবাটিতে সকলের সমান অধিকার রয়েছে তা অনুধাবন করা;

(গ) পরিবেশগত অর্থনীতি অর্থাৎ আরও ন্যায়-সঙ্গত, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই অর্থনীতি হতে হবে যা কাউকে পিছনে ফেলে রাখে না; 

(ঘ) সরল জীবনযাত্রা গ্রহণ অর্থাৎ সহজ সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে জগতের বেদনাদায়ক বিষয়সমূহে সচেতন হওয়া ও নিরাময়ের উদ্যোগ নেওয়া; 

(ঙ) পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা অর্থাৎ পরিবেশগত সচেতনতা এবং কর্মকাণ্ড তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবেশ সংরক্ষণ ও চেতনায়নমূলক শিক্ষা পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করা;

(চ) পরিবেশগত আধ্যাত্মিকতা অনুশীলনে গভীরভাবে অনুধাবন করা যে মানবজীবন তিনটি সম্পর্কযুক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যথা-  ঈশ্বরের সঙ্গে, আমাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে এবং পৃথিবীর সঙ্গে; সুতরাং সৃষ্টি-কেন্দ্রিক উপাসনা উদ্যাপনকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন করা এবং 

(ছ) সমদায়িত্ববোধ প্রেরণায় অংশগ্রহণমূলক বহুমাত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করা। পত্রটির মৌলিক অনুপ্রেরণায় আমাদের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।  

৩. এ উপলক্ষে পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এক বার্তায় জোর দিয়ে বলেছেন- আসুন, একসাথে কাজ করি, কেবলমাত্র আমরা এইভাবেই আমাদের ভবিষ্যতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই ধরিত্রী গড়তে সক্ষম হবো, এটাই আমাদের আশা। পোপ মহোদয় বার্তায় অভিন্ন বসতবাটির যত্নে তাঁর আবেদনটি 'পুনর্নবীকরণ' করে বলেন- "আসুন আমরা আমাদের মাতৃভূমির যত্ন নিতে এগিয়ে আসি; আসুন, আমাদেরকে সম্পদের শিকারী করে তোলে এমন স্বার্থপর প্রলোভনকে কাটিয়ে উঠি; আসুন, পৃথিবী এবং সৃষ্টির উপহারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই; আসুন, আমরা এমন একটি জীবনযাত্রা এবং এমন একটি সমাজের উদ্বোধন করি যা শেষ পর্যন্ত পরিবেশ বান্ধব ও পরিবেশ-টেকসই হয়। সবার জন্য আরও একটি সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দিতে আমাদের সুযোগ রয়েছে। পিতা ঈশ্বরের নিকট থেকে আমরা একটি সুন্দর বাগান পেয়েছি, আমাদের  সন্তানদের জন্য আমরা একটি মরুভূমি রেখে যেতে পারি না।" তিনি সকলকে এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানান বিশেষত- পরিবার, ধর্মপল্লী, ডাইয়োসিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, খামার, সংগঠন, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে জড়িত সম্পৃক্ত হতে আহ্বান জানান। 

৪. বিশেষত বিগত 'লাউদাতো সি বছর' এ (মে, ২০২০ - মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ) ৭০০,০০০ গাছ লাগানোর উদ্যোগের জন্য কার্ডিনাল টার্কসন এ সময় বাংলাদেশের কাথলিক খ্রিস্টভক্তগণের প্রশংসা করেছেন। ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন' নামক পুণ্য দপ্তর আগামী ৪ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দে আসিসির সাধু ফ্রান্সিস এর পর্বদিবসে 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' এর কর্মসূচি উদ্বোধন করবে এবং এ সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে, পরিবার, ধর্মপল্লী, পালকীয় সেবা কমিশনসমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, সেমিনারী, ব্রাদার হাউজ, সিস্টারদের কনভেন্ট, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, সকল প্রকার প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং দলগতভাবে নিজেদের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে আহ্বান করছে যেন একই দিনে আমরা একযুগে বহুমাত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করতে পারি।

৫. ভাটিকানের 'পরিবেশ ও সৃষ্টি' নামক দপ্তরের সমন্বকারী ফা. যোসট্রম আইজাক কুরিথাডাম বলেছেন- আমাদের অভিন্ন বসতবাটির এবং সৃষ্টির সমস্ত সদস্যদের প্রতি যত্নবান হতে পবিত্র আত্মা কীভাবে বিশ্বব্যাপী মণ্ডলীকে উদ্বুদ্ধ করছে এটি দেখতে অনুপ্রেরণাদায়ক; 'লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম' হল সমন্বিত পরিবেশ বিষয়ক চেতনায় পুরোপুরি টেকসয়ের অভিমুখে যাত্রা। তিনি আরো বলেছেন- লাউডাতো সি বছর' সমাপ্ত হওয়ার পর থেকেই সকল খ্রিস্টভক্তগণ ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাৎসরিক বিশ্বব্যাপী প্রার্থনা এবং অভিন্ন বসতবাটির যত্ন উদযাপনের জন্য 'সৃষ্টি উদ্যাপন কাল' এর দিকে মনোনিবেশ করবেন। ভাটিকানের 'মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তরের সেক্রেটারি মন্সিনিয়র ব্রুনো মারি দোফে- সকল খ্রিস্টভক্তদের বিশ্বব্যাপী 'সৃষ্টি উদ্যাপন কাল' পালনে পুণ্যপিতা পোপ ফান্সিসের আহ্বানের কথা স্মরন করে দিয়ে বলেছেন- আমরা বিশপদের এবং মাণ্ডলিক সংস্থাসমূহকে 'সৃষ্টি উদযাপন কাল' সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে নিজস্ব বিবৃতি প্রকাশ করতে উৎসাহিত করছি।

৬. অন্যদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পর্ষদও ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ৫ জুন এ দিনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে  ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়ে আসছে। চলতি বছর দিবসটি উদযাপনের বিষয়বস্তু ছিল ধরিত্রীর বাস্তুতন্ত্র অর্থাৎ প্রকৃতি-পরিবেশ ‘পুুনর্মূল্যায়ন, পুনর্গঠন, পুনরুদ্ধার’ (Reimagine, Recreate, Restore) করা। তবে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের পরিবেশ দিবসটির আরেকটি গুরুত্ব আছে- আজ থেকে জাতিসংঘের ‘বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক’ (২০২১-২০৩০ খ্রিস্টাব্দ) শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, এত দিন ধরে আমরা উন্নয়ন কর্মকণ্ডসহ আমাদের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সমন্বিত পরিবেশের যে ক্ষতি করেছি, তা পুনরুদ্ধারের জন্য বিশ্বের সব কটি রাষ্ট্র আগামী এক দশক অবিরত চেষ্টা করবে।

৭. করোনাভাইরাস মহামারির এ অবরুদ্ধ সময়ে নিজের অবস্থানে থেকে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার জন্য কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থপূর্ণভাবে ‘লাউদাতো সি অ্যাকশন প্লাটফর্ম’ কর্মপ্রক্রিয়ায় জড়িত হতে পরিকল্পনা করতে পারি। ধরিত্রীর যত্ন নেওয়া, তত্ত্বাবধান করা, সুরক্ষা করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য আমরা সবাই যার যার নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা, আত্মনিয়োগ ও মেধা অনুসারে জড়িত হয়ে ঈশ্বরের হাতের যন্ত্র হিসেবে সহযোগিতা করতে পারি (লাউদাতো সি, অনুচ্ছেদ ১৪)। আসুন, ধরিত্রীর নিরাময়ে ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তরের এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে আগামী ৭ বছর সময় সক্রিয়ভাবে সাথে থাকি। আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ অবিরত চালিয়ে যাই; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।




রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি

ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পুুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর আহ্বানকে সফলতা দান করতে আগামী ৭ বছর সময়কে "লাউদাতো সি কর্মসূচি প্লাটফর্ম" ঘোষণা করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে, পরিবার, ধর্মপল্লী, পালকীয় সেবা কমিশনসমূহ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল, সেমিনারী, ব্রাদার হাউজ, সিস্টারদের কনভেন্ট, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং দলগতভাবে নিজেদের কিছু সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অঙ্গীকার ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে আহ্বান করেছেন।আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে পোপ ফ্রান্সিস এর সর্বজনীন পত্র ‘লাউদাতো সি’ এর অনুপ্রেরণায় করণীয় কিছু উপলব্ধি ও কিছু সুপারিশ এখানে প্রদান করা হল যা নিজেদের জন্য একটি "অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি" তৈরি করতে সহায়তা করবে।

১. নিজের বেদনাদায়ক কষ্ট অনুভব- অন্তরে গভীরভাবে উপলব্ধি করি আবর্জনা এখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলে অপরিচ্ছন্ন-অস্বাস্থ্যকর নর্দমা তৈরি করেছি; গাছ কেটেছি কিন্তু রোপনে অবহেলা করে পরিবেশে ভারসাম্য নষ্ট করেছি; স্বার্থপরতা ও অতিভোগের কারণে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ করে ফেলেছি; প্রতিনিয়ত প্রচুর পানি অপচয় করছি, খাল ও নদীর জল বিষাক্ত করে ফেলেছি; এভাবে প্রকৃতি ও প্রতিবেশীদের প্রতি অনেক ক্ষতি  ইতোমধ্যে করেছি। এসব স্মরণ করে অনুতপ্ত হই ও মন-পরিবর্তন করি  এবং প্রকৃতি ও  প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অঙ্গীকার করে পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস এর সাথে আধ্যাত্মিকভাবে একাত্ম থাকি। 

২. সৃষ্টির মঙ্গলবার্তা বিশ্বাস- আমাদের আশা হল- ঈশ্বর, যিনি শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি পৃথিবীতেও হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং সব ধরনের অমঙ্গলকে পরাস্ত করতে পারেন। তিনি আমার, আপনার সহযোগিতায় তা করতে চান। আজ থেকেই আমার ও আপনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপে বড় কিছু অর্জন সম্ভব, কেননা আমরা জানি যে পরিবর্তন সম্ভব; এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা;

৩. সৃষ্টি-কেন্দ্রিক উপাসনা প্রস্তুত- যারা পরিবেশ সংরক্ষণ ও বাস্তব্যবিদ্যা গবেষণা করেন তাদের প্রতিপালক আসিসির সাধু ফ্রান্সিস এর মধ্যস্থতায় প্রার্থনা করতে পারি; সৃষ্টি-কেন্দ্রিক বা লাউদাতো সি উপাসনা উদযাপনকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন করা যায়;

৪. পরিবারের যত্ন- আমি যেখানে বসবাস করছি সেটা একটি পরিবার; আমাদের পরিবার হল সৃষ্টি ও প্রকৃতির একটি অংশ; পরিবারের আরো বেশী যত্ন নিব। খাবারের সময়, অবসর সময়ে অথবা বিনোদনের সময়ে প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং দীনদরিদ্রদের অবস্থা নিয়ে সহভাগিতা করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং গরীবদের জন্য ভাল কিছু উদ্যোগ নিতে সন্তানদের উৎসাহিত করা যায়;

৫. তিনটি ‘পি’ (three P’s)- ‘লাউদাতো সি’ পত্রটির নিবিড় সমন্বয় ও কার্যকরী সাড়াদানের ক্ষেত্রে তিনটি ‘পি’ (three P’s) অনুধ্যানে করণীয়সমূহ স্মরণ করতে পারি- plant বা গাছ-গাছড়া লাগানো, protect বা রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও promote বা সংবর্ধিত করা অর্থাৎ ‘লাউদাতো সি’র মাণ্ডলিক শিক্ষা সকলের নিকট প্রকাশ ও প্রচার করা;

. পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা- নিজের দেহ থেকে শুরু করে জামাকাপড়, ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, সমাবেশস্থল, প্রভৃতির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা; সন্তানদেরও অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করবো। বাড়ির চারিপাশের প্লাস্টিক, নর্দমা ও আবর্জনা পরিস্কার করতে উদ্যোগ গ্রহণ ও নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা যায়;

. অপচয়রোধ ও ঋণ পরিশোধ- প্রয়োজন মাফিক কেনাকাটা, পরিমিত রান্না করা; প্রয়োজন অতিরিক্ত খরচপাতি, জিনিসপত্র ও দ্রব্যসামগ্রীর অপব্যবহার, ভোজনবিলাস ও অতি ভোগের মানসিকতা বর্জন করা; বাড়িতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিভিশন, এসি, পানির কল, বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের পর বন্ধ রাখাতে সর্বদা সচেতন থাকব। ক্রেডিট ইউনিয়নসহ সকল প্রকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা; ঋণ গ্রহণ করে বিনোদন বা উৎসব আয়োজন থেকে বিরত থাকা;

. স্বাস্থ্যসম্মত খাবার- শাকসবজি, ফুল ও ফলের বাগান করা এবং খাবারের হিসেবে ব্যবহার করা। প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান করা; মাংস গ্রহণ পরিমিত করা, পরিমিত পরিবেশন ও পরিমিত ভোগ, দেশীয় পণ্য ব্যবহার করার মনোভাব তৈরি করা; 

. বাগান ও জৈবসার- রান্নাঘরের অবশিষ্টাংশ, পাতা-লতা ও আবর্জনাগুলি মিশ্রিত করে উত্তম সার তৈরি করা যায় এবং এসব গাছের বৃদ্ধিতে আরও ভাল সার হিসেবে সহায়তা করে। কর্মস্থলে ও বাড়িতে খালি জায়গায়, টবে, বারান্দা, ছাদে অথবা জানালার পাশে গাছ রোপণ ও নির্ধারিত গাছ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সন্তানদের দায়িত্ব বন্টন করে দিতে পারি। গ্রামের বাড়ির আঙ্গিনায় অথবা শহরে বাসাবাড়িতে টবে বারান্দায় বা ছাদে অথবা জানালার পাশে শাক-সবজি-ফুল বাগান তৈরি করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা; 

১০. দূষণমুক্ত পরিবেশ- শব্দ, বায়ূ, জল এবং সকল প্রকার দূষণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা; গণপরিহন ব্যবহার করা এবং পরিবহণের দূষণকারী কর্মক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে; 

১১. পানি অপচয়রোধ- যারা পানীয় জলের চরম সংকটে আছে তাদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে আমরা  স্নানে পরিমিত পানি ব্যবহার বা আগের চেয়ে একটু কম পারি ব্যবহার, হাতমুখ ধোয়ার সময় কলের পানি নষ্ট না করি, যতটুকু পান করতে চাই ততটুকু পানি গøাসে ঢেলে পান করতে পারি। আমাদের এমন ক্ষুদ্র ক্ষ্রদ্র অভ্যাস পানি অপচয় অনেক হ্রাস করবে; 

১২. প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা- আমরা এমুহূর্তে প্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারছি না তাই সঠিকভাবে ব্যবহার ও প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পলিথিন ব্যাগ একেবারেই বাদ দিতে হবে কারণ এর ক্ষতির ধরন বহুমাত্রিক এবং বাড়ছে- মাটি নষ্ট করে জমিতে ফসল উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করছে, শহরে নর্দমা বের হওয়ার পথ বন্ধ করে ব্যাপক ক্ষতি করছে এবং আগুনে দিলে গ্যাস হয়ে বায়ুদূষণ করে মানবদেহের সংঘাতিক ক্ষতি করবে; 

১৩. কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহার- পাটের তৈরি চটের ব্যাগ অথবা ভারী ও শক্ত কাপড় পুনঃব্যহার করে ব্যাগ তৈরি করে বাজারে বা বাড়ির নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়;

১৪. পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা- লাউদাতো সি পত্রটির অনুপ্রেরণায় সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক শিক্ষা বিস্তার করা সম্ভব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ডাইয়োসিস, ধর্মপল্লী, ক্লাব, সংগঠন, ক্রেডিট ইউনিয়ন, পরিবারে, যোগাযোগ মাধ্যমে, ধর্মশিক্ষাদানে ও অন্যত্র। পরিবেশগত সচেতনতা এবং কর্মকাণ্ড তৈরি লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবেশগত চেতনায়নমূলক শিক্ষা পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করােত পারে; 

১৫. পরিবেশ বিষয়ক বই ও পত্রিকা পড়া- ব্যক্তিগতভাবে এবছর পরিবেশ বিষয়ক একটি বই পড়ার অঙ্গীকার করা; প্রকৃতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের গ্রাহক হয়ে পাঠ করা; লাউদাতো সি বিষয়ক একটি শিক্ষা সেমিনারে অংশগ্রহণ করা; যা যা নতুন শুনছি তার কিছু অংশ মনে রাখুন। আমরা যা শুনি তার মাত্র ১০ শতকরা এক বছর পর মনে রাখতে পারি। আগ্রহ অটুট থাকলে মনে রাখার শতকরা হারও বাড়বে;

১৬. অভিজ্ঞ সহায়ক নিমন্ত্রণ- আপনার সংঘের, বা প্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহণকারী অংশীজনের সাথে আপনার শিক্ষণ সহভাগিতার ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে আপনাকে সহায়তা করতে বাইরে থেকে অভিজ্ঞ সহায়ক বা বক্তা ডেকে আনুন;

১৭. নিজে জানুন ও অন্যকে জানান- আমাদের দেশে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে সরকার কাজ করছে, দেশী সংস্থা কাজ করছে, বিদেশী সংস্থা কাজ করছে। তাদের কাজ সম্পর্কে জানা ও অপরকে জানানো, তাদের কাজে সহযোগিতা করা। প্রকৃতি ও পরিবেশ বা লাউদাতো সি বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জোটে (হবঃড়িৎশরহম) যোগ দিন; নিজের চেষ্টায় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ, ফলাফল ও প্রতিরোধ সম্পর্কে আরো বেশী করে জানুন। পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে মণ্ডলীর শিক্ষা কী, মহামান্য পোপ মহোদয় বার বার কী আহবান রাখছেন- তা জানুন;

১৮. একজনকে দায়িত্ব প্রদান- আপনার সংঘে বা প্রতিষ্ঠানে এমন একজনকে বাছাই করুন যে কী না আপনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আগামী বছর এই বিষয়ে নিজে আরো জানবেন, সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের সকলকে জানাবেন ও বাইরে অন্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন; 

 ১৯. সহভাগিতা ও আলোচনা- আপনার যা যা নতুন শিক্ষণ (learning) তা তা আপনার সংঘের বা প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার অংশীজনদের (stakeholders) জানান। যেসমস্ত চিঠি, দলিল, লেখা পাচ্ছেন তা সহভাগিতা করা, তাদের কেন জানাচ্ছেন তা-ও ব্যাখ্যা করুন। আপনার প্রত্যাশা খুলে বলুন। কোনো নিয়মিত সভায় সকলের সাথে এই বিষয় আলাপ করতে ঘন্টাখানেক সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে;

২০. কর্মস্থলে সচেতনতা- কর্মস্থলে প্রয়োজন ছাড়া কাগজে প্রিন্ট না করা, প্রয়োজনে কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট করা এবং সুযোগ থাকলে কাগজ পুনঃব্যবহার করতে পারি; কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য অফিস সরঞ্জামসমূহ ব্যবহারের পরে বন্ধ রাখব; দলীয়ভাবে গাড়ী ব্যবহার করার মাধ্যমে কার্বন ব্যবহার হ্রাস করতে পারি; 

২১. সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ- কর্মস্থলে ‘ধন্যবাদ’ ও ‘স্বাগত’ এমন সৌজন্যসূচক শব্দ ব্যবহার, ইতিবাচক কথা বলা, ইতিবাচক শব্দ ব্যবহার, নোংরা শব্দ পরিহার, সমালোচনামূলক কথা না বলা, বিচারকি কথা-বার্তা পরিহার কর্মপরিবেশ সুন্দর রাখে। অযাচিত চাটুকারিতার স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা; কাজের সময় অযথা অন্যের নিকট বসে সময় নষ্ট না করা বরং তাকে কাজ করতে দেয়া এবং নিজে ভাল কাজ করা, কাজে সৃজনশীল চিন্তা করা, অবসর সময়ে উদ্দীপনামূলক লেখা পড়ে নতুন চিন্তা আহরণ করা; 

২২. সত্য মতকে সত্যরূপে গ্রহণ- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিত্তিহীন গুজব ও ‘মতের অরণ্য’ থেকে  বেরিয়ে এসে মূলধারার গণমাধ্যমের উপর নির্ভর করা যেন যথার্থ আনন্দ, গভীর তৃপ্তি, প্রকৃত সত্য আহরণ করা যায়;

২৩. ছুঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি বর্জন- অর্থনীতি, উৎপাদন ও জিনিসপত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে- সংগ্রহ কর-চাহিদা পূরণ কর-ছুঁড়ে ফেলার (take-make-dispose) বর্তমানযুগে প্রচলিত উন্নয়নের মডেলের পরিবর্তে লাউদাতো সি'র অনুপ্রেরণা- পুনর্নবীকরণ-পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ-অন্যের সাথে সহভাগিতার (renew-remake-share) রূপান্তরশীল প্রক্রিয়া প্রচলন ও অনুুসরণ করা;

২৪. পবিত্র আহ্বান হিসেবে গ্রহণ- নিজের কল্যাণের কথা ভেবেই প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশীর সুরক্ষা সুসংবাদটি পবিবারের আপনজন ও বন্ধুবান্ধবদের জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই এটি পবিত্র একটি আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করা যায়;

২৫. নিজের অংশগ্রহণটা অপরিহার্য- ইতোমধ্যে যদি ভাল কিছু করি তবে 'আরো ভাল' কিছু করতে চেষ্টা করি, যদি আরো ভাল কিছু করে ফেলেছি তবে 'উত্তম কিছু' করতে চেষ্টা করি, আর যদি উত্তম কিছু করে থাকি তবে 'অতি উত্তম কিছু' করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারি;

২৬. অবিরত প্রার্থনা করি- যদি কিছুই করতে না পারি তবে পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে সরাসরি যারা জড়িত তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তেনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের জন্যেও প্রার্থনা করুন। দীনদরিদ্র মানুষ যারা অমানবিক ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন তাদের জন্য প্রার্থনা অব্যাহত রাখুন। এই বিশ্ব জানতেও পারেনা প্রার্থনায় যে কতো আশ্চর্য্য কাজ হয়!     

করোনাভাইরাস মহামারী শিখিয়েছে আমাদের আরও বেশি যতœবান ও রক্ষণাবেক্ষণ মনোভাব প্রয়োজন। পোপ মহোদয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা ‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ উদ্যাপন করছি। ইতোমধ্যে অনেকে নীরবে কাজ করে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেছি। ভাটিকানের ‘মানব উন্নয়ন’ নামক পুণ্য দপ্তর পোপ ফ্রান্সিসের এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে আগামী ৭ বছর অবিরত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করবে। আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ "অভিন্ন বসতবাটির সুরক্ষায় আমাদের আচরণবিধি" অনুসরণ করি তবেই মহান কিছু অর্জন সম্ভব হবে। ধরিত্রীর বুকে আনবে নতুন ছন্দ, জাগাবে নতুন আশা; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।



 পঞ্চাশত্তমী মহাপর্ব দিবস, রবিবার,  মে ২৩, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, লাউদাতো সি সপ্তাহ-২১

বুধবার, ১৯ মে, ২০২১

অধ্যয়ন, অনুধাবন ও অনুশীলন

 খ্রিস্টমণ্ডলীর কর্মনীতি বা কর্মকৌশল হলো  সদ্বিবেচনা বা বিবেক। সদ্বিবেচনা এমন একটি নৈতিক গুণ যা মঙ্গল-উদ্দেশ্য ও সঠিক পদ্ধতি জানার জন্য সাহায্য করে। সদ্বিবেচনার প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ লক্ষ্যণীয়: (ক)  পরিস্থিতি জানা - “দেখা” (খ) যাচাই করা বা শুনা বা বিশ্লেষণ করা এবং (গ) কাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া  বা কাজ করা।  সদ্বিবেবচনা এমন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে যা সঙ্গতিপূর্ণ, বাস্তবধর্মী ও দায়িত্বশীল।‌ আমরা যখন ‌'লাউদাতো সি সপ্তাহ -২১' পালন করছি তখন নিম্নের বিষয়সমূহ নিজেরা গভীরভাবে অনুধাবন এবং অনুশীলন  করে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার জন্য কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সপ্তাহটি অর্থপূর্ণ করতে পারি। 

(১) পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা- নিজের দেহ থেকে শুরু করে পোশাক-আশাক, ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, সমাবেশস্থল, প্রভৃতির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা; 

(২) অপচয়রোধ- প্রয়োজন অতিরিক্ত খরচপাতি, জিনিসপত্র ও দ্রব্যসামগ্রীর অপব্যবহার, ভোজনবিলাস ও অতি ভোগের মানসিকতা বর্জন ; 

(৩) দূষণমুক্ত পরিবেশ- শব্দ, বায়ূ, জল এবং সকল প্রকার দূষণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা; গণপরিহন ব্যবহার করা এবং পরিবহণের দূষণকারী কর্মক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে; 

(৪) স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ- শাকসবজি, ফুল ও ফলের বাগান করা এবং খাবারের হিসেবে ব্যবহার করা। প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান করা; মাংস গ্রহণ কমানো, পরিমিত পরিবেশন ও পরিমিত ভোগ, দেশীপণ্য ব্যবহার;

 (৫) সত্য মতকে সত্যরূপে গ্রহণ- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিত্তিহীন গুজব ও ‘মতের অরণ্য’ থেকে  বেরিয়ে এসে মূলধারার গণমাধ্যমের উপর নির্ভর করা যেন যথার্থ আনন্দ, গভীর তৃপ্তি, প্রকৃত সত্য আহরণ করা। সকলে সত্য মতকে অবিচল সত্যরূপে গ্রহণ করতে পারলে নানা প্রকার বিদ্রোহ, বিভ্রাট ও মনোবিকার যার ফলে সৃষ্ট এক ধরণের মানসিক আর্বজনা থেকে সমাজ রক্ষা পাবে এবং

(৬) ছুঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি বর্জন- অর্থনীতি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে সংগ্রহ কর-চাহিদা পূরণ কর-ছুঁড়ে ফেলার (Take-Make-Dispose) বর্তমানযুগে প্রচলিত উন্নয়নের মডেলের পরিবর্তে লাউদাতো সি'র অনুপ্রেরণা- পুনর্নবীকরণ-পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ-অন্যের প্রয়োজনে সহভাগিতার (Renew-Remake-Share) রূপান্তরশীল প্রক্রিয়া প্রচলন ও অনুুসরণ করা। 

আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ অবিরত চালিয়ে যাই; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।



শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ - মে ১৬-২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

 LAUDATO SI WEEK 21, May 16-25, 2021

পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিস আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার উপর মে ২৪, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ‘লাউদাতো সি’ সর্বজনীন পত্রটি লিখেছেন। তাঁর আহ্বানে ‘লাউদাতো সি বছর’ (মে, ২০২০ থেকে মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ) পালনের সমাপ্তিতে মে ১৬-২৫, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ তারিখে ‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ উদযাপন হতে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারির এ অবরুদ্ধ সময়ে নিজের অবস্থানে থেকে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার জন্য কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থপূর্ণভাবে সপ্তাহটি উদযাপন করতে পারি। যেমন-

১. আমাদের জীবনযাপনে অপরিহার্য উপাদান (মাটি, বায়ু, আগুন, জল) নিয়ে গভীর মনোযোগ প্রদান করতে পারি; কিন্তু এসবই
এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন এবং আমাদের সকলকেই ভাবিয়ে তুলছে; আমরা সবাই ভুক্তভোগী;

২. দীনদরিদ্র, দুর্বল ও দুঃখকষ্টে জর্জরিত মানুষের আর্তনাদে আরও অধিক মনোযোগ দিতে পারি;

৩. একটি আরও ন্যায়-সঙ্গত, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই অর্থনীতির প্রতি মনোযোগ দিতে পারি যা কাউকে পিছনে
ফেলে রাখে না;

৪. সহজ-সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ-জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কিছু কিছু বিষয়ে সচেতনতা লাভ করা যায়- (ক)
পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, (খ) অপচয়রোধ, (গ) দূষণমুক্ত পরিবেশ, (ঘ) প্রকৃতিজাত, বিশুদ্ধ ও সুষম খাদ্য আহার ও পানীয় পান
করা;

৫. আমাদের অভিন্ন উৎপত্তি সম্বদ্ধে, আমাদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে এবং সম্পদসমূহ সবার সাথে সহভাগিতা করার
দায়িত্ব সম্বদ্ধে পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা, জ্ঞান ও সচেতনতা গ্রহণ করতে পারি;

৬. ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রকৃতির ধ্যানমগ্নতায় বিস্ময়বোধ, প্রশংসা, আনন্দ এবং কৃতজ্ঞতা অন্তরে অবিরত অনুভব করা; সৃষ্টি-কেন্দ্রিক
উপাসনা উদযাপনকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশগত ধর্মশিক্ষা, প্রার্থনা, নির্জনধ্যান ও মানব গঠন কার্যক্রম আয়োজন
করা যায় এবং

৭. এ সংকটকালে একযোগে এই ধরিত্রীকে বাঁচানোর চিন্তায় মনোযোগী হওয়া ও অংশগ্রহণমূলক বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ খুবই
প্রাসঙ্গিক ভাবনা।
আসুন, একসাথে, একত্রে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাসমূহ অবিরত চালিয়ে যাই; ‘আমরা সবুজ, আমরা সুন্দর’ থাকি।



রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

10 saints whose care for creation still inspires us today


The Catholic Church has made caring for creation a key tenet of the faith for centuries, long before Pope Francis wrote Laudato Si’ and placed that millennia of Catholic teaching in the context of today’s ecological crisis. As thousands of Christians around the world celebrate the Season of Creation this month, may we all find further inspiration from these 10 saints whose passion and love for God’s creation can still motivate us to act today.


St. Philip Neri, 1515-1595

St. Philip Neri is best known for his founding of the Oratory Movement, but St. Philip also is remembered and celebrated for his welcoming of vegetarianism.

Neri embraced the diet because of animal welfare. When he was given birds, he would set them free, and he preferred to let flies escape through a window rather than swat them.

His care extended to land-based animals as well. Neri would let captured mice flee to safety and often expressed sympathy for animals being taken to slaughter.

Feast day: 26 May


St. Augustine, 354-430

Pop quiz: Is the below quote about “things like mice and fleas that are real but inconvenient” from Laudato Si’ or St. Augustine?

‘‘so strong is this preference, that, had we the power, we would abolish [them] from nature altogether, whether in ignorance of the place they hold in nature, or, though we know it, sacrificing them to our own convenience.’”

Such warnings against self-centeredness in regards to nature show yet again how the Catholic Church has long been about caring for all of God’s creation.

Arthur O. Ledoux, a philosophy professor and lecturer at the Augustinian Study and Legacy at Merrimack College in the U.S., wrote about St. Augustine’s deep love for creation in “A Green Augustine: On Learning to Love Nature Well.”

“For Augustine the ideal would be to see nature as God sees it, feeling deeply both its beauty and its impermanence, loving nature without clinging to it,” Ledoux wrote.

“With such clear seeing would come love and the motivation for sustained and skillful action.”

Feast day: 28 August


St. Hildegard of Bingen, 1098-1179

Kings and queens and bishops and popes sought St. Hildegard’s counsel. But the Benedectine nun was perhaps most knowledgeable about admiring and appreciating every creature.

Among her most inspirational words:

“The Earth sustains humanity. It must not be injured; it must not be destroyed.”

“Every creature is a glittering, glistening mirror of divinity.”

“Creation is the song of God.”

“Humankind is called to co-create, so that we might cultivate the earthly, and thereby create the heavenly.”

“In Hildegard’s worldview, a beam of sunlight, the fragrance of a flower, or the graceful movement of a swan were all participants in the holy chorus of creation,” wrote Cynthia Overweg in a story titled, “Hildegard of Bingen: The Nun Who Loved the Earth.”

Feast day: 17 September

 

St. Therese of Lisieux, 1873-1897

Although she was only 24 when she died, St. Therese left behind a stacks of writings, instructions almost, on how to admire and be in awe of creation.

The below quotes are from the Society of the Little Flower, an organization dedicated to spreading devotion to St. Therese.

“Far away on the horizon we could see the great mountains . . . The sight of these beauties made a deep impression on my thoughts; I felt as if I were already beginning to understand the greatness of God and the wonders of heaven.

“The sun’s light that plays on the cedar trees, plays on each tiny flower as if it were the only one in existence; and in the same way our Lord takes a special interest in each soul.”

Feast day: 1 October


St. Benedict, 480-547

St. Benedict, the father of Western monasticism, has seen his love for creation spread throughout the world since his death more than 1,400 years ago.

One of the vows for Benedictines is “stabilitas,” the idea that one should be grounded in a community and place and establish a relationship of care and connection to that place.

Father Abbot John Klassen, OSB, writes, “As Benedictine monastics we want to be people who ‘stay in a place long enough that the spirits can influence us.’ By coming to know a place deeply . . . monastic communities will make decisions with an understanding of their consequences.”

Feast day: 11 July

 

St. Francis of Assisi, 1181-1226

Where to begin with St. Francis of Assisi, the patron saint of ecology? Perhaps Pope Francis describes his Spirit-filled time on Earth best:

“He was a mystic and a pilgrim who lived in simplicity and in wonderful harmony with God, with others, with nature and with himself. He shows us just how inseparable the bond is between concern for nature, justice for the poor, commitment to society, and interior peace.” (LS 10)

Feast day: 4 October, the final day of the Season of Creation

St. Francis of Assisi, photo by Enrique López-Tamayo Biosca


St. Kateri Tekakwitha, 1656-1679

St. Kateri Tekakwitha was 20 before she was baptized, yet her life lights the way for all those who seek to live in greater communion with creation.

In July 1677, Tekakwitha was being treated as an outcast in her community and receiving threats because of her faith. So she traveled for two months and more than 200 miles of woods and rivers to the Catholic mission of St. Francis of Xavier at Sault Saint-Louis in Canada.

There, Tekakwitha lived with other Indigenous Catholics and continued devoting her life to God. Her legacy is honored today by many organizations, including the Saint Kateri Conservation Center, which helps organizations and families convert their plots of land or yards into healthy habitats that honor the life of the patron saint of Native American and First Nations People, ecology, and the environment.

Read more: St. Kateri Center celebrates Laudato Si’

Feast day: 14 July

 Saint Kateri Habitats honor creation. Photo by Deacon Paul Kipfstuhl.


St. Kevin of Glendalough, 498 (reputedly) -618

“It is a return to that simplicity which allows us to stop and appreciate the small things, to be grateful for the opportunities which life affords us. . .” (LS 222)

St. Kevin was the model of simplicity. He lived in a cave about 30 feet above the water, according to the Glendalough Hermitage Centre. He ate little and slept on stones.

He also became friends with all creatures, much like St. Francis of Assisi would do 700 years later.

Feast day: 3 July


St. John Paul II, 1920-2005

St. John Paul II compelled Catholics to care for creation and to undergo an “ecological conversion” throughout his 27-year papacy. For him, it was personal. He often made time for creation, hiking and skiing in his native Poland and elsewhere.

Speaking in 2001, he said: “If we scan the regions of our planet, we immediately see that humanity has disappointed God’s expectations. Man, especially in our time, has without hesitation devastated wooded plains and valleys, polluted waters, disfigured the earth’s habitat, made the air unbreathable . . .

“We must therefore encourage and support the ‘ecological conversion’ which in recent decades has made humanity more sensitive to the catastrophe to which it has been heading.”

Feast day: 22 October

 

 St. John of the Cross, 1542-1591

So meaningful were the life, actions, and writings of St. John of the Cross that Pope Francis dedicated a section of Laudato Si’ to the Spaniard:

“Standing awestruck before a mountain, he or she cannot separate this experience from God, and perceives that the interior awe being lived has to be entrusted to the Lord: ‘Mountains have heights and they are plentiful, vast, beautiful, graceful, bright and fragrant. These mountains are what my Beloved is to me. Lonely valleys are quiet, pleasant, cool, shady and flowing with fresh water; in the variety of their groves and in the sweet song of the birds, they afford abundant recreation and delight to the senses, and in their solitude and silence, they refresh us and give rest. These valleys are what my Beloved is to me.’”

(Collected from GCCM)

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পৃথিবীর সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের যত্ন -বিশপ জের্ভাস রোজারিও

প্রিয় ভাইবোনেরা,

সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর সর্বশক্তিমান ও প্রজ্ঞাবান, তাঁর মত বিচক্ষণ আর দয়ালু আর কেউ নেই। তিনি তাঁর সমস্ত ভালবাসা দিয়েই এই বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেছেন, তিনি সৃষ্টি করেছেন গ্রহ-তারা আর সূর্য্য-চন্দ্র। তাঁরই দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবী আর তার সকল বস্তু আর জীব-জন্তু-পশুপাখী, গাছপালা, মাছ-সরিশৃপ, পোকা-মাকড়, ইত্যাদি সবই। আর শেষে পরম মমতায় ও ভালবাসায় মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনিই সৃষ্টি করেছেন সাগর ও নদ-নদীসহ জলাভূমি আর পাহাড়-পর্বত। বিশ্বের সবকিছু তিনি মানুষের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বরই সৃষ্টি করেছেন আকাশ বাতাস ও মাটি-জল-বায়ু সব কিছুর বিধি-বিধান বা প্রাকৃতিক নিয়ম। এই সব কিছুই ঐশবিধানেরই প্রতিফলন। ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন সবকিছুরই বিপুল অগ্রগতির সম্ভাবনা দিয়ে। আর তিনি সব কিছু মানুষের হাতে ন্যস্ত করেছেন, আর চেয়েছেন যেন মানুষ বা মানব জাতি এই তাঁর সকল সৃষ্টির যত্ন ও রক্ষা করে এবং উন্নয়ন ও সম্ভাবনার স্ফুরণ ঘটায়। এইসব বিষয় অবশ্য অনেকের কাছেই অমূলক, তারা এইসব থিওরি বিশ্বাস করে না। কোন মানুষ বিশ্বাস করুক বা না করুক ঈশ্বর তাঁর কাজ ঠিক মতোই করে যান আপন প্রজ্ঞায়। 

এখন প্রশ্ন হলো মানুষ বা মানব জাতি কি ঈশ্বরের সেই আস্থা ও দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পেরেছে? পৃথিবীর আব-হাওয়ার বা জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে যে বিশ্বব্যাপী যে সকল বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও বিপর্যয় নেমে আসছে, তা নিয়ে সকলেই শঙ্কিত ও তার কারণ কি তা নিয়ে এখন সকলেই ভাবছে। এই যে এখন পৃথিবীর ওজোন স্তর ধ্বংশ হয়ে যাচ্ছে, কার্বনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে,  আব-হাওয়া ক্রমেই উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে যাচ্ছে, উচু পর্বত মালার বরফ ও গ্লাচিয়ার গলে যাচ্ছে, তার জল গড়িয়ে গিয়ে সমুদ্রের জল বাড়িয়ে দিচ্ছে, সুনামী-ভূমিকম্প আর ঘুর্ণিঝড়-সাইক্লোন হচ্ছে, বন্যা-খড়া, ইত্যাদির মত অযাচিত সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসছে, তার জন্য আমরা কাকে দায়ী করব? ঈশ্বর কিন্তু তাঁর সৃষ্টির কোন অযত্ন করেন না, এইসব কিছুর জন্য তিনি নিশ্চয়ই দায়ী নন। 

এর জন্য আমরা মানুষেরাই কোন না কোনভাবে দায়ী - আমরা যারা অতিভোগবাদী ও বস্তুবাদী হয়ে এই পৃথিবী নামের গ্রহটির উপর শোষণ ও ভক্ষণ নীতি চালিয়েছি। বিগত শতাব্দীর তথাকথিত শিল্পবিপ্লবের পূর্বে মানুষের এই ভোগবাদী মনোভাব কিছুটা নিয়েন্ত্রনে ছিল; কিন্তু এর পরে ক্রমে ক্রমে বিশ্বব্যাপী মানুষ হয়ে পড়েছে নিয়ন্ত্রনহীন বস্তুবাদী ও অতিমাত্রায় ভোগবাদী। এরই ফলে পৃথিবীর সকল সম্পদ যে যত বেশী ভোগ করতে পারে, তার একটি অশুভ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। পৃথিবীর যত খনিজ সম্পদ অতিমাত্রায় আহরণ করা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ জীবাস্ম জ্বালানি তৈল উত্তোলন ও অতিমাত্রায় পোড়ানো হয়েছে, কলকারখানার কার্বন নি:সরণ ও বর্জ্য দিয়ে পরিবেশ দূষণ করা হয়েছে, যে গাছপালা বনভূমি পৃথিবীর ফুসফুস সেই গাছপালা ও বনভূমি কেটে উজার করা হয়েছে, আনবিক চুল্লি থেকে শুরু করে ইটের ভাটা পর্যন্ত সব কিছুই পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ওজোনস্তর বা গ্রীনহাউজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করেও পৃথিবীর অনেক স্থানে মরুয়ায়ন করা হয়েছে। মানুষ আরও কত কিছু করেই না এই মায়ের মত ধরিত্রীর ক্ষতি করেছে আর তা করে চলেছে। ঈশ্বরের সকল সৃষ্টির প্রতি মানুষের অবহেলা আর অযত্ন পৃথিবীকে আজ প্রায় ধ্বংশের মুখে ফেলে দিয়েছে। 

তাই এই পৃথিবী যে আমাদের সকল মানুষের অভিন্ন বাসগৃহ সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে ২০১৫ খ্রি: পোপ ফ্রান্সিস “লাউদাতো সি’” (তোমার প্রশংসা হোক) নামক একটি সর্বজনীন পত্র লিখেন - যা এই ২০২০ খ্রি: পাঁচ বছর পূর্ণ করেছে। পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও তা সুরক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করে পোপ ফ্রান্সিস মে ২০২০ থেকে মে ২০২১ পর্যন্ত একটি বছর “লাউদাতো সি’” বর্ষ ঘোষণা করেছেন। পোপ ফ্রন্সিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ঈশ্বর ভালবেসে এই পৃথিবীসহ সকল সৃষ্টিই মানুষকে দিয়েছেন আর মানুষের তত্ত্বাবধানে রেখেছেন তা প্রয়োজনে পরিমিতভাবে ভোগ করতে, উপভোগ করতে আর সেই সাথে তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে। আমরা এই পৃথিবী বা ধরিত্রীর মালিক নই, আমরা ঈশ্বরের এই উপহারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবক। 

আমরা মানুষেরা এই পৃথিবী ও সৃষ্টির প্রতি যে অবহেলা করেছি আর পরিবেশের যে ক্ষতি করেছি, তা পুষিয়ে নিতে আমরা কি করতে পারি, সেই বিষয়ও আমাদের ভাবতে হবে। সুখের বিষয় এই যে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ু পবির্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে বেশ আগে থেকেই সচেতনতা তৈরী হয়েছে। পোপ ফ্রান্সিস সেই সচেতনতার রেশ ধরেই পরামর্শ রেখেছেন যেন আমরা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৃষ্টির সুরক্ষায় আরও দায়িত্বশীল আচরণ করি। আর সেই কারণেই আমাদের ভোগবাদী ও বস্তুবাদী মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। 

পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের য ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েছে, এখন আমরা কি করব সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তা আমাদের খুঁজে পেতে হবে। এর জন্য আমরা কিছু কাজ করতে পারি যা আমাদের পক্ষে খুবই সহজ।  লাইদাতো সি বছরে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বসহ বিবেচনা কারতে পারি- গাছপালা লাগাতে পারি, আবর্জনা সঠিক ব্যবস্থাপনা করা যায়, জৈবসার প্রয়োগ করে কৃষি ও পারিবারিক বাগান করতে পারি  এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে পারি।  আমরা পৃথিবীকে “সবুজ ও পরিচ্ছন্ন” করতে ও রাখতে পারি। সবুজের জন্য অবশ্যই আমরা যত বেশী সম্ভব গাছপালা লাগাতে পারি ও কৃষিকাজের সম্প্রসারণ করতে পারি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্বারা মানব কল্যানে যে শিল্পকারখানা স্থাপিত হয়েছে, তা চলুক কিন্তু কৃষিকে অবহেলা করে নয়। আমরা যতটা সম্ভব জীবাস্ম জ্বালানী শক্তি কম ব্যবহার করতে পারি আর নবায়নযোগ্য শক্তি (যেমন সৌরশক্তি, বায়ু ও জলশক্তি ব্যবহার করা) ব্যবহার বাড়াতে পারি। যে কোন ভাবেই সম্ভব আমরা যেন ঈশ্বরের সকল সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের যত্ন নেই সেইটা হল আমাদের ঈশ্বর প্রদত্ত দায়িত্ব। আমরা এই দায়িত্বের কথা যত বেশী মনে রাখব ততই আমাদের মানব জাতির জন্য মঙ্গল হবে। আসুন আমরা আমাদের মাতৃস্বরূপা ধরিত্রী, অর্থাৎ আমাদের অভিন্ন বাসগৃহ, এই পৃথিবীর সকল সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বাঁচাই সেই সঙ্গে নিজেরাও বাঁচি। শুধু তাই নয়, আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা একটা সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে পারব। 

সকলের অনেক শুভেচ্ছা রইলো

বিশপ জের্ভাস রোজারিও, রাজশাহীর বিশপ ও চেয়ারম্যান, সিবিসিবি ন্যায় ও শান্তি কমিশন




মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

10 SMALL WAYS TO LIVE OUT LAUDATO SI

Our responsibility to care for our Earth and for the poor we can bring others to Christ and lead them to His holy Church.

Listed below are ten practical ways we can help our world and fellow man in the spirit of Laudato Si :

1. Be just slightly less comfortable.  We are a society that loves comfort. But that comfort is expensive and energy wasting. So, be just slightly less comfortable, and you can save big on energy bills and environmental resources. 

2. Recycle. We all know we should, but many don’t. Look into your town’s recycling center and services, and make plans to do it. Many towns will do curbside pickup on trash days of recycling materials, so there is less an excuse not to jump on the recycling bandwagon.

3. Buy used. When possible, buy used items. It will save you money, and you will reuse something that someone didn’t need anymore, reducing the resources you need and consume.

4. Fix rather than replace. Rather than chucking a broken toy or appliance, first figure out if there is a way to fix it. Most of us do this simply to save money, but it is a small way to preserve resources and consume less.

5. Be content without more, even if you have the means for better. And if you have the means for better, use the excess to bless others. This one is very difficult for many of us, myself included. Who doesn’t love to have nice things? But truly, we don’t need the bigger TV. We don’t need rooms full of toys. But our neighbor may need food; a child might need clothes; a local organization might need money or hand-me-downs. Bless your community with charitable giving.

6. Discern needs from wants. This goes along with being content. We don’t need lots of artwork or knick-knacks, or even lots of vacations (and souvenirs to remember it by). Do we need a larger home, or is it simply something we want? Minimalism is “in” these days, so embrace it; it’s one of the few modern trends we as Catholics can and probably should get behind.

7. Have children use the backside of printed paper, and use both sides of a page when drawing/coloring. This is a simple but effective way to teach children about limited resources and using them wisely.

8. Be kind to foreigners and immigrants. When you encounter someone who speaks English poorly, be patient, even offer assistance. Don’t mock accents or hinge your charity on how someone came to this country or whether they are a contributing member of society. We need to show love to one another, regardless of our background.

9. Get out of debt and avoid debt when possible. This comes as part of responsible ownership of resources. If we constantly need more, and use debt to get it, we lie to ourselves about the limits of our own resources. Having debt is not necessarily shameful, but we should be cautious about it, and aim to avoid it. And in doing so, we will help our neighbors to use their own resources prudently by now contributing to the keeping up with the Joneses.

110. Unplug. One aspect of Laudato Si is the concern of how technology is unplugging us from real relationships and providing us a shield to hide behind. If you find yourself logging into social media several times a day, playing games, etc, take a break. If it is a big temptation, as habits often are, have your spouse change your password. You will marvel at how life comes together in peace and how much closer you can get to God if you decide to reduce internet use to the tool it is meant to be as, not the time-wasting and life-wasting venture it has become.

We all can do our part to make the world we live in a better place. We can all love one another and the earth God gave us, and show Him how much we value and respect His gifts. (Collected)