বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

আশাকে বাস্তব কর্মে রূপান্তর করা (From Hope to Action)

 “আশা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে- শোচনীয় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ ও উপায় আছে... ... আমরা সবসময় কিছু না কিছু করতে পারি” (লাউদাতো সি, অনুচ্ছেদ-৬১)।

আমাদের অভিন্ন বসতবাটির  যত্নের দশ বাস্তব পদক্ষেপ

‘লাউদাতো সি সপ্তাহ’ (মে ১৭-২৪, ২০২৬ খ্রিষ্টবর্ষ) হলো বিশ্বব্যাপী একসাথে পথ চলার একটি সুবর্ণ সুযোগ, যখন সকলে জীবন-জীবিকা ও প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার জন্য আশা-ভরসাকে বাস্তব কর্মে রূপান্তর করতে উদ্বুদ্ধ হয়। এ সপ্তাহে ব্যক্তি, ধর্মপল্লি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও সংগঠন, ধর্মসংঘ কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত পরিবেশের জন্য অন্তত একটি বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। যা ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের প্রবর্তিত ‘লাউদাতো সি অ্যাকশন প্ল্যাটফর্ম’-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সমবেত উদ্যোগসমূহের অংশ হয়ে উঠবে।

এই সপ্তাহে আপনার বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই ও সঙ্গতিপূর্ণ একটি পদক্ষেপ বেছে নিন এবং আজই বাস্তবায়ন শুরু করুন।

জগতের আর্তনাদে সাড়াদান

১. আপনার জ্বালানি ব্যবহার  হ্রাস করুন

এই সপ্তাহে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমানোর একটি বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করুন। 

উদাহরণ-

অপ্রয়োজনীয় আলো, গ্যাস, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ রাখা

শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে এসি বা হিটার ব্যবহার সামান্য কমানো

আগামী এক মাস বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অঙ্গীকার গ্রহণ

নিজেদের জ্বালানি ব্যবহার পর্যালোচনা করে একটি নির্দিষ্ট সাশ্রয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে।


২. স্থানীয় জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করুন

সীমিত পরিসরে প্রকৃতি-পরিবেশ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আয়োজন করুন।

 উদাহরণ-

দেশীয় গাছ লাগানো

ফুল ও নান্দনিক তৃণভূমির বাগান তৈরি

ছোট দলে বৃক্ষরোপণ করা ও অন্যদের উৎসাহ প্রদান

একটি ছোট বাগানও পরিবেশ পুনর্জাগরণের প্রতীক হতে পারে।


দীনদরিদ্রদের আর্তনাদে সাড়াদান

৩. পরিবেশ বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করুন

সমদায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার একটি বাস্তব কাজ বেছে নিন।

 উদাহরণ-

অসহায়দের সেবাদানরত প্রতিষ্ঠান, বিশপীয় কমিশন, ছাত্র ও যুব সংগঠন বা ক্লাবে অংশীজন হওয়া 

নিজের একমাসের ব্যক্তিগত খরচ থেকে অল্প অর্থ দান করা

পরিবেশগত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ অনুদান সংগ্রহ করা

সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণ মানেই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের যত্ন নেওয়া।


৪. ধর্মপল্লি ও প্রতিষ্ঠান সমাজসেবার জন্য উন্মুক্ত করুন

অব্যবহৃত স্থানগুলো সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করা যেতে পারে। 

উদাহরণ-

স্থানীয় সেবামূলক সংগঠনকে সভা করতে জায়গা প্রদান করা

বিনামূল্যে পাঠদান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেবাকেন্দ্র চালু করা

সংগঠন বা ক্লাবকে দিবস উদ্যাপনে সুযোগ-সুবিধা প্রদান 

অনেক সময় ধর্মপল্লির উন্মুক্ততাই সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।


পরিবেশগত অর্থনীতি বিস্তার

৫. স্থানীয় ও নৈতিক উৎপাদনকারীদের সহায়তা করুন

এ সপ্তাহে এমন পণ্য ও প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন করুন যারা মানব মর্যাদা ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে। 

উদাহরণ-

স্থানীয় কৃষক, গ্রাম্য বাজার/হাট ও সমবায় থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়

ধর্মপল্লিতে কৃষি খামার ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নিয়ে বাজার আয়োজন

নৈতিক সরবরাহকারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে ক্রয়নীতি প্রচলন

আমাদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত স্থায়ী ও মজবুত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।


৬. বিনিয়োগ ও ক্রয়নীতির পর্যালোচনা করুন

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত পরিবেশের পক্ষে না বিপক্ষে তা বিবেচনা করতে পারে। 

উদাহরণ-

জীবাশ্ম জ্বালানি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সম্ভাবনা যাচাই

পরিবেশবান্ধব সরবরাহকারীদের মূল্যায়ন

পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও স্থায়ী উপকরণ (সৌরবিদ্যুৎ) ব্যবহারের অঙ্গীকার

সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই-এর উদ্যোগ গ্রহণও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


সহজ-সরল জীবনধারা গ্রহণ

৭. প্লাস্টিক ও বর্জ্য-আবর্জনা হ্রাস করুণ

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার পর্যালোচনা করুন। 

উদাহরণ-

ধর্মপল্লির অনুষ্ঠানে এককালীন কাপ ও প্লেট ব্যবহার বন্ধ করা

পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পৃথক সংগ্রহব্যবস্থা চালু করা

ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র উদ্যোগ বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।


৮. উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস অনুশীলন করুন

খাদ্যাভ্যাস মানুষ ও ধরিত্রী উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। 

উদাহরণ-

ধর্মপল্লিতে সমবেতভাবে একবেলা ‘নিরামিষ ভোজন’ উদ্যোগ গ্রহণ 

বাড়ির রান্নায় ব্যবহৃত সবজি বাগান করা

স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার তৈরির প্রণালী শেয়ার করা

কোনো কোনো ব্যক্তিগত অভ্যাসও ধরিত্রী সুরক্ষায় যুক্ত হতে পারে।


পরিবেশ সুরক্ষাবিষয়ক শিক্ষা

৯. ‘লাউদাতো সি’ পুনর্পাঠ ও সহভাগিতা করুন

সহযোগিতামূলক ও একত্রে পথচলা সিনোডাল পরিবেশ তৈরি করুন। 

উদাহরণ-

খ্রিষ্টযাগে ও সমবেত প্রার্থনার পরে ‘লাউদাতো সি’ পত্র থেকে পুনর্পাঠ

সভা, সেমিনার, কর্মশালা ও স্কুল কার্যক্রমে সিনোডাল প্রক্রিয়া গ্রহণ

যুবসমাজকে তাদের পরিবেশগত উদ্যোগ উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া

পরিবেশগত রূপান্তরের পথে শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।


পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্দীপ্ত আধ্যাত্মিকতা ও সমাজকে ক্ষমতায়ন

১০. সৃষ্টির জন্য প্রার্থনা ও গণসচেতনা বিস্তার করুন

প্রার্থনা যেন কর্মে অনুপ্রেরণা জোগায়, পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্দীপ্ত করে। 

উদাহরণ-

খ্রিষ্টযাগে সৃষ্টির জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা

উন্মুক্ত স্থান বা ‘লাউদাতো সি’ বাগান বা গ্রটোতে প্রার্থনা আয়োজন

উদ্যোগসমূহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ ও সমাজকে সম্পৃক্ত করা

বিশ্বাসী সমাজ আশাকে কর্মে রূপান্তর করতে পারে।


আসুন, আশাকে বাস্তব কর্মে রূপান্তর করি

‘লাউদাতো সি-২০২৬’ সপ্তাহে সমন্বিত পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ন্যূনতম একটি বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। আপনার পদক্ষেপসমূহ শেয়ার করুন যাতে তা বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত উদ্যোগের অংশ হয়ে ওঠে। আপনার ছোট ছোট পদক্ষেপ বিশে^র হাজারো উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে। পরিবেশগত সংকট নিরাময়ে পোপ লিও চতুর্দশ বলেছেন, ‘কথা থেকে কাজে’ নামার সময় এখনই। আসুন, আশাকে কাজে রূপান্তর করি এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র পদক্ষেপটি একত্রে যুক্ত হয়ে ‘যত্নের-সংস্কৃতি’ গড়ে তুলি। 


আসুন, প্রার্থনা করি-

‘লাউদাতো সি’ - “হে আমার প্রভু, তোমার প্রশংসা হোক।”

হে দীনদরিদ্রদের ঈশ্বর,

এ জগতের যারা পরিত্যক্ত, অবহেলিত যাদের কথা সবাই ভুলে থাকে

অথচ যারা তোমার চোখে অতি মূল্যবান

তাদের পুনরুদ্ধার করতে আমাদের সাহায্য কর।


হে প্রেমময় ঈশ্বর,

এই জগতের সকল সৃষ্টির যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে

ভালোবাসা প্রকাশের পথ আমাদের দেখাও,

যত্নের সংস্কৃতি গড়তে আমাদের অনুপ্রাণিত কর।


হে দয়াময় ঈশ্বর,

আমরা যেন তোমার ক্ষমা লাভ করতে পারি এবং

অভিন্ন বসতবাটিতে যেন তোমার দয়া প্রকাশ করতে পারি।

‘লাউদাতো সি’ - “হে আমার প্রভু, তোমার প্রশংসা হোক।” আমেন


পাদুয়ার সাধু আন্তনী: মূল্যবোধ প্রতিপালনে পথপ্রদর্শক

ভূমিকা

ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের প্রকৃতি-পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরাক্ষবিষয়ক বিশ্বজনীনপত্র ‘লাউদাতো সি’ এর জোরালো আহ্বান ছিল উদাসীনতার সংস্কৃতির বদলে খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের আলোকে  যত্নের-সংস্কৃতি প্রতিপালন করা।” পাদুয়ার সাধু আন্তনীর জীবন-আচরণ আমাদেরকে খ্রিস্টসমাজে আরো সম্পৃক্ত থাকতে, সেবাযত্ন করতে এবং ঈশ^রের বাণী ঘোষণার মাধ্যমে খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ লালনপালন করতে উদ্বুদ্ধ ক’রে থাকে। তিনি বর্তমান বাস্তবতায় খুবই প্রাসঙ্গিক একজন আদর্শ পথপ্রদর্শক, একজন মহান ধর্মপ্রচারক, একজন মহান সাধু, দরিদ্রের বন্ধু এবং মূল্যবোধের আলোকে যত্নের-সংস্কৃতি গড়ার এক নিবেদিত প্রাণ প্রবক্তা। তিনি ১৫ আগষ্ট, ১১৯৫ খ্রিস্টবর্ষে পর্তুগালের লিসবনে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ফ্রান্সিসকান ধর্মযাজক হিসেবে ১৩ জুন, ১২৩১ খ্রিস্টবর্ষে ইতালীর পাদুয়াতে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ জগতে তাঁর জীবনযাপন ছিল অল্প সময়ের কিন্তু ঈশ্বরের  বাক্য অন্তরে প্রতিপালন ও প্রচারে অবদান ব্যাপক। ঈশ্বর ও মানব প্রেমিক আন্তনীর মৃত্যুর এগারো মাসে মধ্যে পোপ নবম গ্রেগরী তাঁকে ৩০ মে, ১২৩২ খ্রিস্টাব্দে সাধু শ্রেণিভুক্ত করেছেন। সাধু আন্তনীর জীবনের কিছু বিষয় আমরা অন্তরে অনুধাবন ও লালনপালন করতে পারি।

১. ঈশ্বরের বাক্যে জীবন রূপান্তরকারী প্রচারক

সাধু আন্তনী ঈশ্বরের বাক্যকে শুধু জ্ঞান হিসেবে নয় বরং জীবন রূপান্তরের নিরাময় শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি ঈশ্বরের বাক্য হৃদয়ে  গ্রহণ ও ঘোষণা করতেন যার ফলে সমাজে অবহেলিত মানুষও নিজেদের মূল্যবান হিসেবে ভাবত এবং মর্যাদা ফিরে পেত। তাঁর বাণী প্রচারে পাপীরা হয়েছে বিশ্বাসী, হতাশগ্রস্থরা পেয়েছে আশা আর ভ্রান্ত শিক্ষার ধর্মদ্রোহীরা ফিরেছে খ্রিস্টের শিষ্য হিসেবে। একবার একদল ধর্মদ্রোহী তাঁর কথা শুনতে অনিহা প্রকাশ ক’রে, ফলে তিনি ইতালীর রিমিনি শহরের নদীতীরে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের  বাক্য প্রচার করতে থাকেন। কথিত আছে হাজারো প্রজাতির মাছ মাথা উঁচু ক’রে তাঁর উপদেশ মনোযোগসহ শুনছিল এবং সুশৃঙ্গল আচরণে সৃষ্টিকূল ঈশ্বরের প্রশংসা করছিল। ফলে ধর্মদ্রোহীরা  ঈশ্বর বিশ্বাস পুনরায় গ্রহণ ক’রে থাকে। এ অলৌকিক ঘটনায় প্রকাশ পায়- সৃষ্টিকর্তা, অপর মানুষ এবং সকলসৃষ্টি পরস্পরে সম্পর্কযুক্ত ভিত্তিতে গতিশীল। পরিবারের শিশু সন্তান, পথভ্রষ্ট যুব এবং প্রার্থনাবিমূখ ব্যক্তিদের নিকট আমরাও সাধু আন্তনী অনুসরণে ঈশ্বরের বাক্য শুনাতে পারি।

খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ কাউকে তুচ্ছ ক’রে না, কাউকে বাদ দেয় না, সবাইকে ঈশ্বরের বাক্যের মাধ্যমে মর্যাদা দিতে শেখায়। আমাদের বাস্তব প্রেক্ষাপটে- আমরা কি ঈশ্বরের বাণী নিয়মিত পাঠ করি ও শুনি? পরিবারে নবাগত শিশু সন্তান, পথভ্রষ্ট যুব এবং প্রার্থনাবিমূখ ব্যক্তিদের নিকট আমরা কীভাবে ঈশ্বরের বাক্য বিশ্বাসসহ প্রচার করি? 

২. ন্যায়পরায়ণ ও শান্তির প্রবক্তা

সাধু আন্তনী দরিদ্রদের কষ্ট উপেক্ষা করেননি। তিনি অন্যায্যতা, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বদা বলিষ্ঠ প্রবক্তা ছিলেন।  তাঁর কাছে দরিদ্ররা দানের বস্তু নয় বরং ভাই-বোন হিসেবে গণ্য ছিলেন। তাদের প্রাপ্য সম্পদ প্রদান, ঋণগ্রস্থ কারাবন্দিদের মুক্ত করা এবং দুর্নীতিগ্রস্থ সম্পদশালীদের এমনকি বিত্তবান যাজকদেরও গরীবের সম্পদ ফিরে দিতে প্রাবক্তিত ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে পাদুয়ার নগরকর্তা ১৫ মার্চ, ১২৩১ খ্রিস্টবর্ষে ঋণে অভিযুক্তদের কারামুক্ত করতে একটি বিধিবদ্ধ নির্দেশনা জারি করেছিলেন। 

অসরকারি সংস্থা ও সমবায় সমিতি থেকে আজ সমাজে অনেক দরিদ্র পরিবার ঋণের চাপে দিশেহার, কেউ কেউ জমি হারায়, কেউ সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষাখরচ দিতে পারছে না।  আজ তিনি নিশ্চয়ই বলতেন-“দরিদ্রকে সাহায্য করো, কিন্তু তাকে ঋণের ফাঁদে ফেলো না।” একবার তিনি এমন এক পরিবারের পাশে দাঁড়ান, যারা ধনী ও ক্ষমতাবানদের দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছিল। ঝুঁকি থাকা সত্তে¡ও তিনি ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেন। সাধু আন্তনীর নিয়মিতভাবে গরীবদের রুটি বিতরণ, পক্ষাঘাতগ্রস্থদের নিরাময় এবং অসুস্থদের সেবার এক উত্তম দৃষ্টান্ত। 

খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ শিক্ষা দেয় নীরব দয়া নয়, বরং সাহসী সহমর্মিতা ও ন্যায়ভিত্তিক যত্ন প্রদান করতে হবে। প্রথমে, পরিকল্পিতভাবে জীবনমান উন্নয়ন ভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করতে হবে, আরযারা ঋণের ভারীবোঝা নিয়ে চলছে যিশুর পবিত্র ক্রুশের দিকে তাকিয়ে মানবমর্যাদা ও জীবনে মূল্য অনুধাবন করতে হবে, ফলে ঋণের ভারীবোঝা থেকে সন্তানদের মুক্ত রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। আমাদের বাস্তব প্রেক্ষাপটে-আমরা কীভাবে সহযোগিতার পাশাপাশি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও ঋণ প্রদানের কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াতে পারি?

৩. পরিবারে যত্নবান পালক 

সাধু আন্তনী ছিলেন পরিবারের রক্ষক, শিশুদের সুরক্ষা, গৃহহারা মানুষের আশ্রয়, পিতামাতাদের পরামর্শদাতা এবং পারিবারিক আধ্যাত্মিক যত্নের একজন প্রতিপালক। তিনি পরিবারে একতা, বিশ্বাস ও শান্তি বিস্তারে পরামর্শ দান, খোঁজ-খবর নেওয়া, প্রার্থনা করা আর ছোট ছোট সহায়তা প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতেন। আমাদের দেশের অসংখ্য মানুষ বিদেশে কাজ করতে যায়, নগরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক হিসেবে কাজ ক’রে, একাকীত্ব ও অনিশ্চয়তা নিয়ে থাকে এবং কিছু কিছু পরিবার বিচ্ছেদ নিয়ে জীবন-যাপন করছে। আজ অনেক যুবক-যুবতী বেকারত্ব, মাদক, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। সমাজ প্রায়ই তাদের দোষ দেয়, কিন্তু খুব কমই তাদের পাশে দাঁড়ায়। যুবকদের শাসন নয় বরং দিকনির্দেশনা; দোষারোপ নয় বরং পরমর্শ দিতে পারি।

খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ চর্চায় সাধু আন্তনী সত্য বলতেন ভালোবাসা দিয়ে। তিনি কাউকে দূরে ঠেলে দেননি।আমাদের প্রেক্ষাপটে-আমাদের ধর্মপল্লি ও প্রতিষ্ঠানে অভিবাসী ও শ্রমিক পরিবারগুলোর যত্নে কী ধরণের পালকীয় পরিকল্পরা আছে? আমরা কি হারিয়ে যাওয়া ভাইবোনদের ফিরে পেতে বিশ্বাসসহ  প্রার্থনা করি? 

৪. নম্রতা ও সরলতার আদর্শ ঈশ্বর সেবক 

সংঘকর্তা আসিসি সাধু ফ্রান্সিক কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেশ প্রদানকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন সাধু আন্তনী। অসাধারণ জ্ঞান ও বক্তৃতার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিরি ছিলেন অতিনম্র ও সরল।  সংঘকর্তা কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত ঈশ^রের বাক্য প্রচারক হিসেবে তিনি ইতালী বলোনিয়া, ফ্রান্সের মন্টপেলিয়ার ও তুলুস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। অন্যদিকে পোপ নবম গ্রেগরী তাঁকে ‘আর্ক অফ দি টেস্টামেন্ট’ উপাধি প্রদান এবং খ্রিস্টীয় পর্বদিবসের ধর্মোপদেশের জন্য নিয়োগ করেছিলেন। ন্যায্যতা ও সরলতার সঙ্গে তিনি বলতেন-‘আমি শিক্ষক নই, আমি ঈশ্বরের এক ক্ষুদ্র সেবক।’ আমাদের সমাজে ক্ষমতা, পদ ও পদবী প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু আন্তনী অনুধাবন করেছেন অহংকার দিয়ে নয় বরং নম্র হৃদয় দিয়েই যত্নের সংস্কৃতি গড়া যায়।

খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ- ক্ষমতার প্রদর্শন নয় বরং মমতা থাকতে হবে, সেবা-যত্নের মানসিকতা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে- আমরা কি ধর্মপল্লি, সংগঠন, প্রতিষ্ঠা ও সমাজে ক্ষমতা, পদ ও পদবী প্রাধান্য দেই নাকি সেবাযত্ন মনোভাব লালনপালন করি?

৫. নির্জন প্রার্থনারত ঈশ্বর প্রেমিক

সাধু আন্তনী তাঁর জীবনে নির্জন প্রার্থনা এবং ঐশ করুণার উপর খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দৈনন্দিন জীবন ছিল একেবারে ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং তাঁর খ্রীষ্টীয় আদর্শকে বাস্তবায়িত করার প্রক্রিয়া। তাঁর প্রার্থনার মাধ্যমে বহু মানুষের জীবনে আশীর্বাদ আনেন। তাঁর জীবন আমাদেও শেখায় যে, ঈশ্বরের প্রেম এবং করুণার মাধ্যমে আমরা সকলেই আশীর্বাদিত হতে পারি। সাধু আন্তনী ভুল শিক্ষা ও বিভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু কখনো ঘৃণা দিয়ে নয়। তিনি সত্য বলতেন প্রেমের সঙ্গে মমতা দিয়ে। তাঁর যত্ন ছিল এমন-যা মানুষকে আঘাত না করে পরিবর্তন বা জীবন রূপান্তরের পথে নিয়ে যায়।

খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ হলো সত্য অনুসরণ ও সত্য বলা, কিন্তু ভালোবাসা হারানো নয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে- বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসাতার সময়ে আমরা কীভাবে ঈশ্বরের আশীর্বাদ ও করুণা প্রার্থনা করি?  আমি কি প্রার্থনায় ঈশ^র প্রেম এবং কাজে মানব প্রেম প্রকাশ করছি? আমার কি পবিত্র খ্রিস্টযাগ ও খ্রিস্টপ্রসাদের প্রতি গভীর অনুরাগ রয়েছে? 

উপসংহার 

সাধু আন্তনীর জীবন আমাদের শেখায়- মূল্যবোধ অনুশীলন, ভালোথাকা, ভালোকিছু করা একটি শুধু অনুভ‚তি নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত; একটি জীবনধারা। তিনি বলতেন- ‘ভালোবাসাহীন বিশ্বাস মৃত।’ আসুন, ভালোবাসি, আশা করি এবং আপেক্ষা করি যাতে সাধু আন্তনীর মধ্যস্থতায় আমাদের জীবনে ঈশ্বরের আশ্চর্য কাজের সাক্ষী হতে পারি। আসুন, তাঁর মধ্যস্থতায় অবিরত প্রার্থনা করি এবংআমাদের দৈনন্দিন জীবনে খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধে যত্নের-সংস্কৃতির প্রচারক হতে পারি। পাদুয়ার সাধু আন্তনী, আমাদের জন্য প্রার্থনা কর। আমেন।


Weekly Protibesshi May 17, 2026