বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২০

অবরুদ্ধ সময়ে যুবকদের সাফল্যের দশ সূত্র


ওয়ারেন এডোয়ার্ড বাফেট একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী, সুদক্ষ বক্তা ও জনহিতৈষী ব্যক্তি। অর্থ গৌরবে ও পদগৌরবে একজন সফল বিত্ত-বৈভবশালী ব্যক্তি হিসেবে তাঁর পরিচিতি বিশ্বময়। বর্তমানে (২০১৯ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর নিট পরিসম্পদের পরিমান ৭৮.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।  ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষদের যে তালিকা প্রস্তুত করেন, সেখানে ওয়ারেন বাফেট তৃতীয় স্থান অধিকারী। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছেলেবেলা থেকেই ব্যবসার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। তাই মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি স্টক (শেয়ার) কিনে বিনিয়োগ করতে আরম্ভ করেন। কিশোরবেলায় তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করতেন। এমনকি চুইংগাম, কোকাকোলার বোতল বিক্রি করতেন তিনি। একসময় তিনি আয়ত্ত করে ফেলেন বিনিয়োগের উত্তম কলাকৌশল। বর্তমানে তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ‘বার্কশাইর হেথওয়ে’ এর অধিনে ৬০টি কোম্পানি রয়েছে। তিনি প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবকল্যাণ কর্মসূচিতে ব্যবহার করেছেন। 

২০১০ খ্রিস্টাব্দে আরেক শ্রেষ্ঠ বিত্তবান ব্যক্তিত্ব বিল গেটসকে সাথে নিয়ে সকল ধনকুবের ব্যবসায়ীদের নিজেদের সম্পদের অর্ধেক মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি সবসময় শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের গুরুত্বপূর্ণ যতসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাঁর পরামর্শ বর্তমানে সাফল্যের সূত্র হিসেবে গৃহীত। তরুণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ থেকে সাফল্যের দশটি সূত্র এখানে আলোকপাত করা হল। যারা ব্যবসা করার জন্য চিন্তা ভাবনা করি অথবা যারা ব্যবসায়ী নই কিন্তু অন্য পেশাজীবি অথবা সমাজকল্যাণ কাজে জড়িত আমরাও ইচ্ছা করলে ওয়ারেন বাফেটের পরামর্শ অনুসরণ করে সাফল্যের আনন্দটুকু উপভোগ পারি।

১. খারাপ সময়ে ধৈর্য ধরা: বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তি যুগে তরুণ সমাজ কিছুটা অস্থির, দ্রুত ফলাফল পেতে আগ্রহী। অন্যথায় হতাশ-নিরাশ হয়ে পরে। ওয়ারেন বাফেটের অন্যতম প্রধান একটি পরামর্শ ‘ধৈর্য ধরুন।  ‌'এমনকি জীবনের খারাপ সময়েও’ । যা তিনি নিজের জীবন থেকে শিখেছেন। ধনকুবের এই ব্যবসায়ী জীবনে নিজের ব্যবসায়ে বেশ কয়েকবার অর্থনৈতিক মন্দা অভিজ্ঞতা করেছেন। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৪৩ কোটি মার্কিন ডলার দিয়ে তিনি ‘ডেক্সার শ্যুজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান কিনেছিলেন। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে সেই কোম্পানিতে তাঁর ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের লোকসান হয়। তিনি ধৈর্যসহ মোকাবেলা করেছেন, আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সফলতার জন্য তিনি দুইটি সূত্র মনে রাখতে বলেন।  প্রথম সূত্র:  ‘কখনো হার মানা যাবে না’ আর দ্বিতীয় সূত্র:  ‘প্রথম সূত্রটা কখনো ভোলা যাবে না।’  তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শটি খুবই যুগোপযোগী ও কার্যকর। মন্দ সময়টি ধৈর্যসহ মোকাবেলা করে সাফল্য দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

২. সর্বদা জীবনের লক্ষ্যে স্থির থাকা: ওয়ারেন বাফেট বলেন- লক্ষ্য ঠিক রাখুন, যা করবেন তাতে পূর্ণ মনোনিবেশ করুন। ব্যবসার রোমাঞ্চে বুঁদ হয়ে কখনো ব্যবসায়িক বুদ্ধি হারালে চলবে না। সর্বদা সজাগ থাকতে হবে নিজের কাজের প্রতি। তিনি আরও বলেন,  ‘এমন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা যাবে না, যা আপনি বোঝেন না।’  ব্যক্তির লক্ষ্য,  মনোযোগ, উৎসাগ ও দক্ষতা যেখানে একীভূত হবে,  সেটিই তার ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে কাজের প্রতি আমাদের উৎসাহ প্রবল সেখানে আমাদের সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

৩. নিজের ওপর বিনিয়োগ অভ্যাস: নিজের একান্ত ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে নিজের সাফল্য। ওয়ারেন বাফেট বলেন,  ‘প্রথমত নিজের দক্ষতা অর্জনের ওপর বিনিয়োগ করুন, দক্ষতা যত বাড়বে, ব্যবসাও তত সৃজনশীল হবে।’  দক্ষতা অর্জনে ব্যবহৃত অর্থ-সম্পদকে খরচ না ভেবে বরং বিনিয়োগ ভাবতে হবে। নিজের জন্য সময় দেওয়া যে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এ কথা তিনি সর্বদা বলেছেন। তাঁর অভিমত হল,  ‘মাঝে-মধ্যেই আমি চুপচাপ বসে ভাবি। অনেকে বলতে পারেন এটা নিরর্থক। কিন্তু ব্যবসা ও বিনিয়োগ সমস্যা নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে।’  ব্যক্তিগত ধ্যান, অনুধ্যান, অনুধাবন, উপলদ্ধি নিয়ে নিয়মিত সময় কাটানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অভ্যাস। সুতরাং ধ্যান করতে শিখতে হবে নিয়মিত, কিছু সময় সকাল বেলা। তবেই নিজেকে জানা যাবে, পেশার গতিবিধি বুঝা যাবে, কাজ মূল্যায়ন করা সহজ ও নিয়মিত হবে। 

৪. সৎ মানুষ সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা: ওয়ারেন বাফেট নিজে নিজে সফল ব্যবসায়ী হননি।বেঞ্জামিন গ্রাহাম, ডেবিড ডড এবং ফিল ফিসার তাঁকে অনেক কলাকৌশল শিখিয়েছেন। সফলতার জন্য অনুপ্রেরণাদানকারী, এনিমেটর, শিক্ষক এবং ভাল সঙ্গী দরকার। তিনি বলেন, সৎলোকের সংস্পর্শে আসুন ও দক্ষ মানুষদের সাথে সময় কাটান। এমন মানুষদের সাথে সময় কাটান, যাঁরা আপনার চেয়ে দক্ষ। আপনার সাথে যারা কাজ করেন তাদের আচার-ব্যবহার যেন ভালো হয় এবং তা যেন আপনাকে প্রভাবিত করে। ব্যবসার ক্ষেত্রে ওয়ারেন বাফেটের মূলমন্ত্র এটিই। তিনি মনে করেন, মানুষের সততা হল অন্যতম একটি বড় গুণ। সবার মধ্যে এই গুণ প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। যারা ব্যবসার ক্ষেত্রে সৎ, যাদের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখা যায় সেই সব মানুষদের আশেপাশে রাখতে হবে।  যাদের সাথে তাঁর বোঝাপড়া ভালো তাদের সঙ্গেই তিনি দীর্ঘদিন ব্যবসা করে আসছেন।

৫. অবিরত পড়ার অভ্যাস করা: একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবে এই ধনকুবের ব্যবসায়ীর বেশ সুনাম আছে। অবসর কাটে তাঁর বই পড়ে। অবসরের ৮০ ভাগ সময় তিনি বই পড়ে অতিবাহিত করেন। তরুণ উদ্যোক্তাদের তিনি যে বইসমূহ পড়তে উৎসাহ দিয়ে থাকেন তার মধ্যে ‘বিজনেস অ্যাডভেঞ্চার’, ‘দ্য এসেস অব ওয়ারেন বাফেট’ এবং ‘দ্য ইন্টেলিজেন্টর’ অন্যতম। এইচবিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এখনো দিনের পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা তিনি বই পড়ে অতিবাহিত করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সম্ভব হলে ৫০০ পৃষ্ঠা পড়ো।’ জ্ঞান হলো ‘চক্রবৃদ্ধি সুদ’ এর মতো- ‘যত পড়বে, তত বাড়বে।’

৬. সমাজের জন্য ভাল কাজ করা: তিনি বলেন, আমরা সমাজে বসবাস করি। সমাজ ভাল থাকলে আমরা সবাই ভাল থাকব। সমাজ থেকে আপনি যেমন পাচ্ছেন, তেমনি সমাজের জন্য কাজ করাও আপনার দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘বহু বছর আগে একজন একটা গাছ লাগিয়েছিল বলেই আজ একজন সেই গাছের ছায়া পাচ্ছে।’ পূর্বসূরিদের অবদান মনে রাখতে হবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে কাজ করতে হবে। তাই তিনি মানবকল্যাণে নিজের সম্পদের বড় অংশ ব্যয় করে থাকেন।

৭. অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শিখা: ওয়ারেন বাফেটের মতে ব্যবসার ক্ষেত্রে অতীত ও ভবিষ্যৎ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিমত, ভবিষ্যৎটা পরিষ্কার দেখতে না পারলেও ব্যবসার ক্ষেত্রে আমরা আমাদের অতীতটা স্পষ্ট দেখতে পাই। সেটাই আমাদের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তিনি আরো বলেন, ‘টাকা উপার্জনের এই খেলায় যদি অতীত ইতিহাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতো, তবে লাইব্রেরিয়ানরাই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ হতেন।’ অতীত অভিজ্ঞতা উপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যতের সঠিক পরিকল্পনাটি করতে হবে। আর পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে হবে।

৮. আর্দশ ব্যক্তিকে অনুসরণ করা: একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনি কাকে অনুসরণ করছেন। আপনি কার মত হতে চান? গভীরভাবে ভেবে এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক করুন। ওয়ারেন বাফেট বলেন, ‘আমাকে বলো, তোমার চোখে নায়ক কে? আমি তোমার ভবিষ্যৎ কী হবে বলে দেব। তার মানে আপনি কাকে আদর্শ বলে মানেন, সেটাই নির্ধারণ করবে আপনার ভবিষ্যৎ। সেবাদান প্রতিষ্ঠান ‘দ্য অ্যাটল্যানটিক ফিলানথ্রপিস’ এর প্রতিষ্ঠাতা ও ধনকুবের ব্যবসায়ী মি. চাক ফিইনি ছিলেন ওয়ারেন বাফেটের নায়ক। যিনি তাঁর পরিসম্পদ  নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া, বারমুডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম দেশে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ন্যায্যতা-শান্তি এবং মানবাধিকার কর্মসূচিতে ব্যবহার করেছেন। 

৯. নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা: দ্য গ্রেট মাইন্ডস অব ইনভেস্টিং বইয়ের ভূমিকায় ওয়ারেন বাফেট লিখেছেন, ‘আমার বাবা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন, আমিও বিশ্বাস করি নিজেকে।’ তাঁর অভিমত, সব সময় তাঁর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছিল। তিনি বলেন, ‘কত টাকা আয় হচ্ছে বা কত লাভ হচ্ছে, এই হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের ওপর বিশ্বাসটা অটুট আছে কি না।’ আত্মবিশ্বাসী হওয়াটা জীবনের জন্য খুবই দরকার।

১০. ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ: জীবনে তিনি যে শতভাগ সাফল্য পেয়েছেন, তা নয়। এমনকি ব্যবসায়িক জীবনে তিনি বড় বড় ভুল করেছেন। তবে ভুল থেকে তিনি শিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনের ভুলগুলো মনে রেখে তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দেন ওয়ারেন বাফেট। তাঁর অভিমত, ভুলগুলোর কথা নিজের সন্তানদের, বন্ধুদের, আপনজনদের জানানো উচিত। যেন তারা একই ভুল না করে।

লেখাটি যখন লিখছি তখন রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে নদীপথে ওয়াটারবাসে একা বরিশাল যাচ্ছি।সকালের রোদে নদীর জলে গাংচিল দলের উচ্ছ্বাস দেখছি আর লিখছি। ভালই লাগছে। বড়সড় জাহাজ যেমন মন্থর গতিতে নদীতে এগিয়ে যাচ্ছে, আবার নদীর জলে তরতর করে চলছে ছোটখাটো জেলেনৌকা, পারাপার নৌকা। নদীর গতিবিধি বুঝে, নৌ-পথের নিয়ম-নীতি মেনে সবাই এগিয়ে চলছে নিজ নিজ গন্তব্যে। বাতাসের তীব্রতা যখন বাড়বে, মাঝি-মল্লা আরো বেশী মনোযোগ দিবে উত্তাল নদীতে নিজেকে নিরাপদ রাখতে, সুরক্ষা দিতে। আমাদের জীবনও তেমন, আমাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ণয় করতে হবে, অনুসরণ করতে হবে মৌলিক নীতি-নৈতিকতা। বিশ্বাস রাখতে হবে সৃষ্টিকর্তার উপর, আস্থা রাখতে হবে নিজের উপর। আমাদের কাজের মৌলিক প্রত্যাশা হল সমাজ সেবা ও মানবকল্যাণ। ওয়ারেন বাফেটসহ প্রায় সকল ধনকুবের ব্যবসায়ীরা তাদের পরিসম্পদের বিরাট অংশ মানবকল্যাণ কার্যক্রমে বিনিয়োজিত করেছেন। এমনি হোক আমাদের তরুণদের ধ্যান-জ্ঞান, স্বার্থপরতা ত্যাগ করে দয়া ও শান্তির জীবন গড়ি, সাফল্যের পরিপূর্ণ আনন্দ উপভোগ করি।


(ফটো সূত্র: ইটারনেট সংগৃহীত)

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

অবরুদ্ধ সময়ে বন্দিরাও ঝুঁকিতে


১. আমাদের অবরুদ্ধ সময় মাত্র একসপ্তাহ, আবার পরিবারের আপনজনদের সঙ্গেই আছি। তবুও অনেকে অস্থির হয়ে উঠেছি, কেউ কেউ মনে করছি জীবনটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এ সময় ভাবছি কারাকক্ষে  ‘একা অন্তরীণ’ অথবা ছোট কক্ষে  ‌‌‌‌'দলবদ্ধ'  গাদাগাদি করে বসবাসরত বন্দিদের। যাদের জীবন আরো নিয়ন্ত্রিত, নির্দেশিত এবং জীবনের গতি অতি মন্থর। করোনাভাইরাস অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে তাই কারাকক্ষে আক্রান্তের ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ মতে- করোনা মোকাবেলার অপ্রতুল প্রস্তুতি, ধারণক্ষমতার বেশি জনবহুল, স্বল্প পরিসরে অধিক বন্দির জীবনযাপন, স্বজনদের সাক্ষাৎ সময়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, নিম্নমানের ভেন্টিলেশন, অরক্ষিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা করোনা সংক্রামণের ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ৬৮ কারাগারের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে থার্মাল স্ক্যানার স্থাপিত হয়েছে । 


২. চীনসহ আরো কয়েকটি দেশে কারাগারে ভাইরাস বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে ইরান ৮৫,০০০ বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে, অন্যদিকে তুরষ্ক ১০০,০০০ বন্দিকে এবং ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, যুক্তরাজ্যও বন্দিদের বিশেষ ব্যবস্থায় সাময়িক মুক্তি দিতে যাচ্ছে। তাছাড়া মানবাধিকার সংস্থাগুলো চিলি ও আফ্রিকাসহ আরো কয়েকটি দেশের বন্দিদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখছে। যাদের অল্প সাজা, যারা অচল, অক্ষম, বৃদ্ধ বা বিপদাপন্ন বন্দিদের সমায়িকভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছে আমাদের সরকার। কর্তৃপক্ষ ৩,০০০ জন বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার চিন্তা করছেন, যা অতি সামান্য সংখ্যক এবং খুবই বিলম্বিত হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া করোনা দুর্যোগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নীতির ভিত্তিতেই বন্দিদের মুক্তির বিষয়টি ভাবতে হবে। বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন অপরাধে বাংলাদেশের ১৩ কেন্দ্রিয় কারাগারসহ মোট ৬৮ কারাগারে প্রায় ৯৬ হাজারেরও বেশী কারাবন্দি রয়েছে, যেখানে ৩৬ হাজারের কিছু বেশী বন্দির জন্য ধারণ ক্ষমতা আছে । বাংলাদেশে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিনগুণের বেশি বন্দি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে কারাগার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি জনবহুল।  

৩. প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও জরিপ মোতাবেক বিদেশী নাগরিকসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে একশত ষাটজনের বেশী খ্রিস্টবিশ্বাসী বন্দি রয়েছে। তাদের মধ্যে তেরজন হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি আছে। কয়েকজনের বিচারের রায় মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হয়েছে। যদিও তাদের জন্য আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু মামলাজটে তাদের আবেদন আটকে আছে। খ্রিস্টবিশ্বাসী কারাবন্দি অনেকের মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যারা এখনও প্রকৃত অপরাধী বলে নিশ্চিত নন।বন্দিদের সুরক্ষার বিষয়টি ভেবে অবরুদ্ধ সময়ে তাদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করা ঠিক হবে না। তবে অন্যভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি পাস্কা উৎসব সামনে রেখে কয়েকটি কারাগারে বন্দিদের জন্য কিছু উপহার সামগ্রীর ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।তাছাড়া বন্দিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কিছু উপাদান শীঘ্র প্রেরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

৪. যুবকদের পাশাপাশি বৃদ্ধরাও কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে। বৃদ্ধদের মধ্যে অনেকে অসুস্থ, অক্ষম, বিপদাপন্ন ও বার্ধক্যজনিত ব্যধিতে অতি দুর্বল। অনেক বন্দি পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কারাগারে বন্দি অবস্থায় হয়তো প্রথম দুই তিন বছর আপনজনেরা মাঝে মাঝে দেখা করেছে। এরপর নিজের গনিষ্ঠজনেরাও সাক্ষাৎকার বন্ধ করে দিয়েছে। মায়েদের সাথে কারাগারে অন্তরীণ আছে অনেক শিশুরাও। কিছু দিন আগে একটি মহিলা কেন্দ্রিয় কারাগারে ৬৯ জন শিশুর সাথে কয়েক ঘণ্টা সময় কেটেছে। তাদের সবার ছোট ছোট, ভিন্ন ভিন্ন গল্প আছে। যা শুনে প্রতিটি মানবিক হৃদয় দীর্ঘশ্বাস ফেলবে, আর গভীর ভাবে বিচলিত হবে। কারা অন্তরীণে জন্ম হয়েছে এমন শিশুদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে। বাংলাদেশী নাগরিকদের পাশাপাশি বিদেশী নাগরিকরাও কারাগারে বন্দি আছে। একটি কারাগারে প্রায় ২৫জন বিদেশী নাগরিকের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আরো একটি কারাগারে বন্দি সাতজন বিদেশী নাগরিক আছে, বিদেশী মহিলা নাগরিকও কারগারে বন্দি রয়েছে। 

৫. অন্তরীণ সময়ে আপনজনদের কথা বলার জন্য কারাগারে টেলিফোন সুবিধা সংযোজন করা হয়েছে। পরিবারের আপনজনদের সাক্ষাৎ সময় দূরত্বে অবস্থানের নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে। কারাগারসমূহে মাইকিং করে স্বজনদের সাক্ষাৎ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে অথবা সাক্ষাৎ সংক্ষিপ্ত করত বলছে। মাদারীপুর কারাগারসহ করোনা সংক্রামণে ঝুঁকিপূর্ণ কারাগারসমূহে স্বজনদের সাক্ষাৎকারের নিয়মকানুন কঠোর করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি আটক হয়ে প্রবেশকৃত বন্দিদের মাধ্যমে করোনা সংক্রামণের ঝুঁকি বেশি বিবেচনা করা হচ্ছে। কারাগারসমূহে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল ও অরক্ষিত।

৬. পোপ ফ্রান্সিস সকল কারাকর্তৃপক্ষের প্রতি সতর্কমূলক বাণী রেখেছেন- করোনা প্রদুর্ভাব সময়ে যথেষ্ট আগে কারাসুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগ হলে মহাদুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে। করোনা অন্তরীণ সময়ে প্রতি মুহূর্তে পোপ মহোদয় সকল বন্দিদের বিশেষভাবে অন্তরে রেখেছেন, প্রার্থনায় একাত্ম আছেন। করোনা অন্তরীণ সময়ে তিনি অনুভব করছেন- অন্যদের সান্নিধ্য ছাড়ার একাকী জীবনযাপন করা মানুষের জন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক। তাঁর বাণী সর্বদা বন্দিদের অন্তরে আশা জাগায় ও তারা জীবনের নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তিনি বলেছেন- অন্তরীণ সময়ে তোমাদের মনের কষ্ট আমি বুঝতে পারি। তোমাদের জন্য প্রার্থনা করি,  পিতা ঈশ্বর তোমাদের অন্তর শান্ত করুন। আমি বুঝতে পারি এক অজানা হতাশা তোমাদের সুখ মুহূর্তে নষ্ট করে দেয় কারণ তোমরা জান না আগামীকাল তোমাদের জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারি ক্ষুদ্র কারাকক্ষে যারা গাদাগাদি করে থাক, যখন-তখন তোমাদের মাঝে করোনা দুর্যোগ নেমে আসতে পারে। সামাজিক দূরত্ব রেখে চলা তোমাদের জন্য একেবারেই অসম্ভব কারণ ছোট এককক্ষে অনেকজন থাকতে হয়। তিনি আরো বলেছেন- আমি আরো বুঝতে পারি তোমরা বন্দি থেকে যখন করোনা সম্পর্কে বাহিরের অস্পষ্ট কিছু খবর জানতে পার এবং হৃদয়ে অনুভব কর তোমাদের আপনজনদের জীবন করোনার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত অথবা জীবন ঝুঁকিপূর্ণ তখন তোমাদের কষ্ট আরো বেড়ে যায়। আমি বুঝতে পারি তোমাদর হৃদয় কাঁদে এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে মন ছুটে চলে আসে। করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে বন্দিদের সুরক্ষার জন্য নিয়মিত প্রার্থনা করতে ও সামর্থ্য মোতাবেক সহযোগিতা করতে পোপ ফ্রান্সিস আমাদের সকলকে আহ্বান জানান। কারণ বন্দিরা বর্তমান এক অনিশ্চিত এবং মানসিক যন্ত্রণাদায়ক কষ্টকর সময় অতিবাহিত করছে। আসুন, বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী’র ন্যায় ও শান্তি কমিশন- ‘কারাগার সেবা দপ্তর’কে সহযোগিতা করি। ধন্যবাদ। 

(ছবি সূত্র: ভাটিকান নিউজ ওয়েবসাইড)

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২০

অবরুদ্ধ সময়ে তাঁর অনুগ্রহে থাকি


১. অবরুদ্ধ সময় শুরুর প্রথম পর্যায়ের একটি ঘটনা। ছাত্র-ছাত্রীরা সুরক্ষিত থেকে ঘরে বসে পড়ালেখা করতে পারে সেই বিবেচনায় সবেমাত্র ক্লাস বন্ধ ঘোষণা হয়েছে। তখন চালক প্রকৃতির এককর্মী রাতে তার বসকে ফোন করে। ফোনে বসকে জানায়- তার মহল্লায় একজন লোক মারা গেছে। ব্যক্তিটি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিল এমন সন্দেহ করা হচ্ছে। সকলের সুরক্ষা চিন্তা করে স্বেচ্ছায়  ‘একা অন্তরীণ’ অবস্থায় থাকতে চাই। চৌদ্দ দিন পর টেস্ট করে করোনাভাইরাস নেগেটিভ বা পজেটিভ নিশ্চিত হওয়া যাবে। সুতরাং আমি আগামীকাল অফিসে আসবো? বস উত্তর দিল- ভালই হয়েছে ফোন করেছ। সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমিসহ সকলে আগামীকাল থেকে ঘরে বসে অফিসের কাজ করবে। তোমার অফিসে আসাটা দরকারী, তুমি ছাড়া অফিসের অনলাইন কার্যক্রম চলবে না। সমস্যা হবে না তুমি অফিসে  ‘একা অন্তরীণ’ থাকবে।

২. আফ্রিকার এক দেশে করোনা সম্পর্কে একটি ইতিবাচক খবর প্রকাশ হয়েছে। সেখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের কোন রোগী সনাক্ত হয়নি। এমন দারুন খবর সম্পর্কে জানতে পৃথিবীর বিখ্যাত মিডিয়া সাংবাদিকরা দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইল। যথারীতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করলেন। শুরুতে সবার পক্ষে একজন মন্ত্রী মহোদয়কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। পরে একজন  জানতে চেয়েছে- বিশ্ব যখন করোনা নিয়ে দিশেহারা তখন আপনাদের ইতিবাচক খবরের রহস্যটি দয়াকরে আমাদের বলুন। প্রথমে মন্ত্রী মহোদয় বললেন- এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের খবর আপনাদের দিতে পারিনি এ জন্য আমি দু:খিত। তারপর বললেন- কারণ পরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় টেস্টকিট এখনও আমাদের হাতে এসে পেীঁছেনি ।

৩. রাজ্যের নির্দেশিত অবরুদ্ধ সময় কাটাতে খেটে খাওয়া সাত দিনমজুর যুবক গাছের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার বলরামপুর ব্লকের ভঙিডি গ্রামের ঘটনা। কারণ অবরুদ্ধ সময় কাটাতে বাড়িতে পৃথক ঘর নাই। সাত যুবক সাত মাস আগে কাজের খোঁজে চেন্নাই গিয়েছিল। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ায় তারা ট্রেনে যাত্রা করে বাড়িতে ফিরে। আপনজনেরা আগেই গাছের ওপর বিভিন্ন ডালে মাচা করে খাটিয়ে চাপিয়ে ‘অন্তরীণ খুপরি’ তৈরি রাখে। কাউকেই যেন বাড়িতে ঢুকতে না হয় সে জন্য গাছের নিচেই আলাদা রান্না ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। আপনজনেরা রান্না উপকরণ গাছের তলায় রেখে যায়, যুবকরা রান্না করে খেয়ে গাছের ওপর শুয়ে-বসে দিন কাটায়। বান্দরবন পাহারে ম্রো  পাড়ার প্রধানফটক পাড়াপ্রধান কর্তৃক বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কেউ আর বাইরে যেতে পারবে না বা বাইরের লোক ভিতরে ডুকতে পারবে না। অবরুদ্ধ সময় কাটানোর এসবই বহু যুগের প্রচলিত প্রথা, করোনা অবরুদ্ধ সময়ে কাজে লেগে যায়।

৪. অবরুদ্ধ সময় বিশ্বের একটি সুন্দর প্রথা হঠাৎ করে বদলে গেছে। কারো সাথে দেখা হলে আবেগে আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরা, হাতমেলানো, কোলকোলি কারা, চুমু খাওয়া, আর্শিবাদ নিতে বা দিতে কপালে হাত ছোঁয়ানো, প্রণাম জানাতে পা স্পর্শ করার রীতি-নীতি হঠাৎ করে করোনা ধামিয়ে দিয়েছে। অবশ্য হাত জোড় করে নমস্কার নিবেদনের প্রথাটা আমাদের পূর্বেই প্রচলিত ছিল। করোনা তা বিশ্বে প্রচলন করে দিয়েছে।

৫. অবরুদ্ধ সময় গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধসমূহ হঠাৎই স্থবির হয়ে গেছে। যুদ্ধারা জেনে গেছে মিসাইল দিয়ে চাইলেই মানুষ মারা যায় কিন্তু করোনা মারা যায় না। নাগরিকত্ব আইনে অপছন্দের মানুষদের দেশতাড়া করা যায় কিন্তু করোনা তাড়ানো যায় না। অনেক সীমানা প্রাচীরে ধারে মানুষ হত্যা বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু করোনা প্রবেশ বন্ধ হয়নি। এটি ভাবনার বিষয় যে দেশে দেশে নির্মিত কংক্রিটের প্রাচীরগুলো মিথ্যা সীমানা। এগুলোর মূল্য খুবই কম কারণ করোনার কোন পাসপোর্টের প্রয়োজন পরে না, করোনা কোন সীমান্ত মানছে না। যুদ্ধগুলো মিথ্যা শক্তি, যা শান্তি আনতে পারে না। অভিবাসী বিষয়ক বাণীতে পোপ মহোদয় বলেছেন- সীমানা প্রাচীর মানুষ দ্বারা নির্মিত তবে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন এক বিশ্বমন্ডল, এক অভিন্ন বসতবাটি। একটু অনুভব করি, অসংখ্য অসহায় মানুষ সাড়া জীবন নিপীড়িত ও অত্যাচারিত। অন্যদিকে ভাইরাসটি আমাদের সকলের উপর সমানভাবে খুব অল্প সময় অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। নিপীড়িত মানুষের তুলনায় আমাদের কষ্ট ক্ষণিকের।

৬. অবরুদ্ধ সময়ে আমরা শান্ত সময় অতিক্রম করছি। শব্দদূষণ আমাদের কাছে সহনশীল ব্যাপার হয়ে পরেছে। বিকট শব্দে হাইটেক সাউন্ডসিস্টেম বেশীরভাগ সময়ে উচ্ছ্বাস নয় উচ্ছৃঙ্খলতাই প্রকাশ করে। পাশের বাড়ির অসুস্থ ব্যক্তিটাকে উপেক্ষা করে, বৃদ্ধ-বিপদাপন্নকে কষ্ট দিয়ে, পরীক্ষার্থীদের অবহেলা করে, শব্দদূষণ করে বিকট আওয়াজের হাইটেক সাউন্ডসিস্টেম পরিবেশদূষণ ছাড়া কী হতে পারে? করোনা আমাদের জীবনকে নীরবতায় স্থবির করে দিয়েছে, নিজেদের কল্যাণেই শব্দদূষণ রোধে পদক্ষেপ নিতে হবে।

৭. করোনা আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সকল উৎসব থামিয়ে দিয়েছে।সমাজে ঋণের টাকা দিয়ে বিয়ে, জন্মদিন, ছেলেমেয়েদের সাক্রামেন্ত গ্রহণ দিনে ব্যয়বহুল আনন্দ-উৎসব আয়োজনের একটা প্রচলন আরম্ভ হয়েছে। তারপর খেলাপী ঋণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সভা-সেমিনারে অনেকবার সমাজের বহুলোকের ঋণগ্রস্ত হওয়ার দিকটি আলোচনায় উঠে আসে। সাময়িক আনন্দ উৎসবে আমরা যতটা তৎপর, তার চেয়ে বেশী তৎপর হতে হবে পারিবারির আর্থিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে। আমাদের আপৎকালীন আর্থিক অবস্থা কতটা মজবুত তা করোনা অতিক্রমনে পরের দিনগুলোতে প্রমান হবে।

৮. করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়ে ব্রেইন স্টোকের পর একজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়, তার আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি । হাসপাতালে ঘুরে ঘুরেও আপনজনেরা তাকে ভর্তি করতে পারেনি। অনেকটা বিনা চিকিৎসায়ই  তার মৃত্যু ঘটেছে বলে পারিবারের অভিযোগ। নিকটতম একজন সহযোদ্ধা আক্ষেপ করে বলেছে- “সবাই যদি এভাবে ভাগ ভাগ বলে তাহলে এই সংকটে রোগীর কী হবে।”  চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ ধরনের বিশ্বাসের সংকট সৃষ্টি হলে মানুষ আরো অসহায় হয়ে যাবে। যদিও চিকিৎসকগণ সংক্রামিত হওয়ার পর ভীতিটা বেড়ে গেছে। সাড়া বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসায় জড়িত ব্যক্তিরা রাতদিন অক্লান্ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রতি রইল সম্মান ও কৃতজ্ঞতা।

৯. অবরুদ্ধ সময়ে জীবনের কঠিন ধাপে অনুভব করছি- আমাদের অতি দরকারী বিষয়সমূহ হল আমাদের নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী যেমন- খাদ্য, জল, Jla ইত্যাদি। এ সময়ে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট সৃষ্টির মাধ্যমে নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী যেমন মজুত করছে, একইভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে মজুত প্রবণতা বেড়ে গেছে। নিজের প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে মানসিক চাহিদা পূরণে অতিরিক্ত কিনে গচ্ছিত রাখছে, ফলে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার দিক থেকে অতিরিক্ত মজুত করা থেকে বিরত থাকতে বলছে। আমাদের নিজের পরিমিত আচরণ দিয়ে সমাজকে সুরক্ষা দিতে পারি।

১০. অবরুদ্ধ সময়ে যারা বৃদ্ধ বা বার্ধক্যজনিত দুর্বল অথবা যারা একাকী সেবাকেন্দ্রে আছে অথবা হাসপাতালে অসুস্থ অথবা নিজেদের বাড়িতে বিপদাপন্ন - তাদের ভয় তারা জানে না আগামীকাল তাদের জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে। আবার যারা বেকার অথবা যাদের স্থায়ী কোন আয়ের উৎস নেই তাদের ভয় কীভাবে সন্তান ও আপনজনদের মুখে খাবার যোগান দিবে। অন্যদিকে রাষ্ট্রনেতাদের ভয় উপযুক্ত সময়ে সঠিক নীতি নির্ধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সচল রেখে নাগরিকদের সর্বাধিক সুরক্ষা কতটুকু সুনিশ্চিত হচ্ছে। অবরুদ্ধ সময়ে আমাদের সকলেরই নিজেস্ব ভয় আছে, আমাদের ভয় আমরা জানি। পোপ মহোদয় আহ্বান করেছেন- যেন ভয়কে জয় করতে সৃষ্টিকর্তার উপর আস্থা রাখি এবং নিয়মিত প্রার্থনা করি।

১১. গত রবিবারের খ্রিস্টযাগের অনুধ্যানে পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন- করোনা আক্রান্তে ক্ষতবিক্ষত বিশ্ব কাঁদছে, আক্রান্তদের আপনজনেরা কাঁদছে, যারা আক্রান্ত তারা কাঁদছে।  লাজার মারা যাবার পরে তার বোন মার্থা, মারীয়া ও উপস্থিত লোকেরা কাঁদছে দেখে যিশু অন্তর থেকে কেঁদে ফেললেন (যোহন ১১:৩৩-৩৫),  খ্রিস্ট যিশু আজ আমাদের সাথে কাঁদছেন। পোপ মহোদয় জানিয়েছেন- তিনিও আমাদের সাথে আছেন, সকলের কান্নার সাথী হয়ে আছেন। প্রতিদিন তিনি গভীরভাবে আমাদের জন্য চিন্তিত এবং নিয়মিত প্রার্থনা উৎসর্গ করছেন। পোপ মহোদয় আহ্বান করেছেন- আমরা সকলে যেমন কাঁদছি তেমনি আমাদের কান্না যেন পরস্পরের প্রতি ভালবাসায় পরিনত হয়। অন্যদের জন্য প্রার্থনা করি, দয়ার কাজ, মঙ্গল কাজ করি। পোপ মহোদয়  “খ্রিস্ট জীবন্ত” পত্রে যুবকদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে যা বলেছেন আজ সকলের জন্যও তা  অর্থপূর্ণ- ক) ভালবাসা বিহীন জীবন শুষ্ক বা আকর্ষণহীণ জীবন; খ) ভবিষ্যতের উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব; গ) পাওয়ার চেয়ে দেওয়াতে আনন্দ বেশী; ঘ) ভালবাসা শুধুমাত্র কথায় নয়, কাজেও দেখাতে হয়। মার্ক লিখিত মঙ্গলসমাচের (৪:৩৫-৪১) শিষ্যদের মতো আমাদেরও খ্রিষ্ট যিশু বলছেন এতো ভয় কিসের, আমি তোমাদের সাথে আছি, বিশ্বাস জাগাও, পরম পিতার অনুগ্রহে থাক। অবরুদ্ধ সময়ে আমরা নিজেরা যত্নবান হয়ে সমাজকে সুরক্ষিত রাখি।

(সহায়ক সূত্র: ভাটিকান নিউজ, বিডিনিউজ২৪.কম)